বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কেন বাড়ছে?

বিবিসি : ১৯৭১ সালে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধারা সনদ নেয়ার জন্য এখন বিপুল আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে অনলাইন এবং হাতে লেখা অন্তত ১ লাখ ৩৪ হাজার দরখাস্ত জমা পড়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা করার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে। আর তাতে পর্যায়ক্রমে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও বেড়েছে। আশির দশকে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের জাতীয় তালিকা তৈরি করা হয়। সেসময় ঐ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এক লাখেরও কিছু বেশি মুক্তিযোদ্ধাকে। পরে আরো কয়েক দফা যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপি সরকারের আমলে প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার তালিকার গেজেট প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের মতো।

বাংলাদেশ স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। যাদের অনেকেই ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়মিত ও বেসামরিক বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধাই আবেগপ্রবণ হয়ে যান। মুক্তিযোদ্ধা আক্কু চৌধুরী বলেন, দেশের স্বাধীনতা ছাড়া তখন কোন কিছু পাওয়ার আশা কেউ করেনি।

‘তখন কিন্তু আমিও যুদ্ধ করতে গেছি। আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আমার কোনো কাগজ নাই। আমি জানতাম না, আমার দেশ দেখবো কীনা, আমি আমার দেশ পাব কীনা, আমি নিজে বেঁচে থাকবো কীনা। তখন কিন্তু আমি মরতে গেছি।’

আক্কু চৌধুরীর মতো এরকম চিন্তাভাবনা থেকেই সবাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। দুই নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন নজরুল ইসলাম। পেশায় ক্ষৌরকার এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠিতরা ছাড়া সবাই এখন সার্টিফিকেটকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক মুক্তিযোদ্ধা এখন ভিক্ষুক। অনেকে রিকশা চালাচ্ছেন। অনেক মুক্তিযোদ্ধা চায়ের দোকানদারি করছে। সব সরকারই তালিকা করেছে। কিন্তু তখন যে সুবিধা ছিল ৩০০-৪০০ টাকা, তা অনেকে নিতেও যায়নি। এখন সরকার যে সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, তাতে সবাই আগ্রহ পাচ্ছে।’

বাংলাদেশে এখন মুক্তিযোদ্ধারা মাসে ন্যুনতম ১০ হাজার টাকা সম্মানী পান। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ৩০ ভাগ কোটা সুবিধা পান। মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি চাকরীজীবী হলে দুবছর বেশি চাকরি করার সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসা, আবাসন ও রেশনসহ নানারকম সুযোগ সুবিধা আছে। এসব সুবিধা পেতে অনেকেই এখন মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আসতে চান।

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক পুন্যব্রত চৌধুরী জানান, পুরনো সব গেজেট এবং লাল তালিকায় থাকা যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, সব যাচাই-বাছাই হবে। ‘এই সার্টিফিকেট নিয়ে তো কোনো বিতর্ক থাকার কথা না। একমাত্র ভারতীয় তালিকা এবং লাল মুক্তিবার্তাটা আমরা সঠিক ধরে নিচ্ছি। যদিও লাল মুক্তিবার্তায় থাকার পরও দেখা গেছে, কেউ কেউ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সনদও স্ক্যানিং করে জাল পাওয়া গেছে।’

বাংলাদেশে সচিব পদমর্যাদার আমলাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হতে দেখা গেছে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য অকাতরে কানাকড়ির দামে প্রাণ আর কোনো জাতি দেয় নাই। সেটাকে যখন আমরা কলঙ্কিত করে ফেলি, কলুষিত করে ফেলি আমাদের লজ্জার শেষ থাকে না।’

মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কামরুল হাসান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের স্বার্থ আছে, প্রভাব আছে। কাজেই একজন, যে নিরপেক্ষ ছিল, সে এখন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং সনদ পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক দল দেখছে আমার সমর্থক বাড়ছে, ভোট বাড়ছে। কাজেই স্বার্থটা উভয় পক্ষের।’

এদিকে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৬ সালে নতুন সংজ্ঞা দিয়েছে। সেখানে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ হয়েছে ১৩ বছর। রণাঙ্গনের যোদ্ধা ছাড়াও একাত্তরে নির্যাতিত নারী বা বীরাঙ্গনা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবদান রাখা পেশাজীবী, শিল্পী, ফুটবল খেলোয়াড়, ডাক্তার নার্স এবং সাংবাদিকরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাবেন। এসব কারণেও মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়বে।

print