ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, আতঙ্ক : সরকারি আমানত বাড়ানোর আহবান

নিজস্ব প্রতিবেদক : অস্থিরতা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আগ্রাসী ব্যাংকিং এর ফলে নগদ টাকার সংকটে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। অন্যদিকে, বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত তুলে নেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শুরু হয়েছে আতঙ্ক। এই আতঙ্ক দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর অর্থমন্ত্রীর সাহায্য চেয়েছেন। সংকট কাটাতে বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত রাখার হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার দাবি জানানো হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের পাহাড়, তাই আমানতের সুদ হার মূল্যস্ফীতির নীচে। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ নয় বরং উল্টো তা কমে যেত। গেল তিন বছর এমন পরিস্থিতি থাকলেও হঠাৎ করেই নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। গেল বছরের এই সময়ে ব্যাংকিং খাতে অলস টাকার পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা হলেও, এ বছর তা কমে হয়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (এবিবি) এর সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান তারল্য সংকটের কারণ হিসেবে, আমানতের চেয়ে ব্যাংকগুলোর আগ্রাহী ঋণ দেয়ারকে দায়ী করেছেন। ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা লঙ্ঘন করায় বাংলাদেশ ব্যাংক সবশেষ মুদ্রানীতিতে এই হার কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। তবে ঋণ-আমানত কমিয়ে দেয়ায় তারল্য সংকট হয়েছে, এটা সঠিক নয় বলে মনে করেন এই ব্যাংকার।

তার সাথে একমত পোষণ করে ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, আগ্রাসী ব্যাংকিং এর কারণে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বহু টাকা বের হয়ে গেছে। অন্যদিকে এসব অনিয়মের কোন বিচার হয়নি। তার মতে, গেল দুই তিন বছরে যেসব অনিয়ম হয়েছে তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন।

তারল্য সংকট মেটানো আমানত বাড়ানো কিংবা ঋণ কমানো যেতে পারে বলে মনে করেন মাহবুবুর রহমান।  তবে ঋণ দেয়া কমিয়ে দিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এতে করে বাজেটে ঘোষিত ৭.৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে। তাই এটি ব্যাংকারদের জন্য এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন মাহবুবুর রহমান। সংকট মেটানোর দ্বিতীয় উপায় হিসেবে আমানত বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

এক্ষেত্রে অবশ্য যেনতেন ভাবে আমানত সংগ্রহে তৈরি হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এতে আমানতের সুদহার আবারো দুই অংকের ঘরে চলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, যখন সবাই মাঠে নামে তখনতো কিছুটা কাড়াকাড়ি পড়েই যায়। কার চেয়ে বেশি দিয়ে নিবে এই প্রবণতা কাজ করে। তবে এই ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা না করতে গেল শনিবার অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সভায় ব্যাংকারদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির।

আমানতের সুদ হার বাড়ায় বাড়ছে ঋণের সুদহারও। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই তাদের উদ্বেগ জানিয়েছেন। এই উদ্বেগকে যৌক্তিক উল্লেখ করে ব্যাংকাররা বলছেন, নির্বাচনী বছরকে সামনে রেখে সাধারণ বেসরকারি বিনিয়োগ কম হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। তবে, চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন হওয়ায় ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে নেয়ার পরিমাণ বাড়বে। আসছে জুলাই থেকেই এই প্রবণতা শুরু হলে ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার সংকট আরো তীব্র হবে বলে আশঙ্কা ব্যাংকারদের।

তবে এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত তুলে নেয়া বন্ধ করা। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকে রাখা আমানতের হার ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। এবিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার যদি এটা করতে পারে তাহলে তারল্য সংকটে খুব একটা পড়তে হবে না। সম্প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভায় অর্থমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন গভর্নর ফজলে কবির।

সাবেক ব্যাংকাররা মনে করছেন, সরকার নিজেই নিজের নির্দেশের কাছে আটকা পড়ছে। এ বিষয়ে আবু নাসের বখতিয়ার বলেন, ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচাতে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি ও চারটি রাষ্ট্রয়ত্ব ব্যাংককে যে ১১শ কোটি টাকা সহায়তার দেয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেই অর্থের যোগান যদি দিতে হয় তাহলে বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি আমানত তুলে নেয়ার পরিমাণ সামনে আরো বাড়তে পারে।

print