রিজার্ভ চুরির এক বছর : সাড়ে ৬ কোটি ডলার আদৌ ফেরত পাবে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির এক বছর পূর্ণ হলো। গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা বৈশ্বিক আন্ত:ব্যাংক লেনদেনে ব্যবহৃত সুইফটের ম্যাসেজিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে। বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় সাইবার ডাকাতির ঘটনা।

একবছর শেষে চুরি বিষয়ক অগ্রগতি হলো, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পেয়েছে। বাকী ৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার কবে ফেরত পাওয়া যাবে বা আদৌ যাবে কীনা তা নিয়ে সংশয়ের দোলাচলে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চুরির টাকা কোথায় গেছে, কারা সেগুলো তুলে নিয়েছে তা জানা গেলেও এখনো চিহ্নিত করা যায়নি হ্যাকারদের কাউকে।

২০১৬ সালের ৪ ফ্রেব্রুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে হ্যাকাররা সুইফটের ম্যাসেজিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাখা অর্থ স্থানান্তরের জন্য বার্তা পাঠায়। প্রায় ১০০ কোটি ডলার সরানোর জন্য হ্যাকাররা ৩৫টি বার্তা পাঠিয়েছিল বলে প্রথমে জানানো হলেও পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, বার্তা পাঠানো হয়েছিল ৭০টি। এসব বার্তা কার্যকর হলে নিউইয়র্ক ফেডে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১৯২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বের হয়ে যেত। তবে ৬৫টি বার্তা কার্যকর হয়নি। পাঁচটি বার্তা কার্যকর হয়ে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বেরিয়ে যায়।

এর মধ্যে ২ কোটি ডলার যায় শ্রীলংকার একটি ব্যাংকে। বাকী ৮ কোটি ১০ কোটি ডলার যায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরশনের (আরসিবিসি) ৫টা ভুয়া অ্যাকাউন্টে। নামের ভুলের কারণে শ্রীলংকায় যাওয়া অর্থ আটকে যায় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তা তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত আনতে সক্ষম হয়। ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে যাওয়া বাকী ৮ কোটি ১০ লাখ উঠিয়ে নেয়া হয়। তারপর সেই অর্থ ফিলরেম নামের একটি রেমিট্যান্স কোম্পানিকে দিয়ে স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তর করা হয়। তারপর সেই অর্থ যায় ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতে। সেখান থেকে যাত্রা করে অজ্ঞাত গন্তব্যে।

এই অর্থের মধ্য থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার ফেরত পেয়েছে। এই অর্থ পাওয়া গেছে চুরির ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তদের একজন, ফিলিপাইনের ক্যাসিনো জাংকেট অপারেটর ও ব্যবসায়ী কিম অং-এর কাছ থেকে। তিনি এই অর্থ ফিলিপাইনের অর্থপাচার প্রতিরোধ সংস্থা এএমএলসির কাছে ফেরত দিলে তা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া শেষে তা নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।

চুরির এই ঘটনা প্রায় দেড় মাস লুকিয়ে রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঘটনা প্রকাশের পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে চাকরি হারান বাংলাদেশে ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ১৫ মার্চ তিনি পদত্যাগ করেন। একই দিন সরিয়ে দেয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নরকেও। ওএসডি করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক অর্থসচিব ফজলে কবির।

রিজার্ভ চুরি নিয়ে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি যথাসময়ে রিপোর্ট জমা দিলেও অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে অজুহাতে অর্থমন্ত্রী সেটি প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছেন। রিপোর্ট প্রকাশের জন্য তিনি বহুবার সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন। জানা গেছে, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে রিজার্ভ চুরির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ৫ জন কর্মকর্তার নাম এসেছে।

বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিও। এই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করছে মার্কিন ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইও। ফিলিপাইনের একাধিক সংস্থাও তদন্ত প্রক্রিয়ায় আছে। এ নিয়ে ফিলিপাইনের সিনেট কমিটিতে ৭ দফা শুনানি হয়। প্রকাশ্য এই শুনানিতে চুরির সঙ্গে জড়িত ফিলিপাইনের একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে রিজাল ব্যাংকের সম্পৃক্ততাও। এ প্রেক্ষিতে আরসিবিসি ২ কোটি ১০ লাখ ডলার জরিমানাও করেছে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিএসপি। ফিলিপাইনের আর্থিক খাতের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ জরিমানা।

এ ঘটনায় সরিয়ে দেয়া হয়েছে রিজাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো তানকে। বরখাস্ত করা হয় ব্যাংকটির জুপিটার রোড শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতো ও কাস্টমার রিলেসন্স অফিসারকে। মায়া সান্তোসসহ রিজাল ব্যাংকের সাবেক ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দেশটির অর্থপাচার বিরোধী কাউন্সিল এএমএলসি।

চুরি যাওয়া রিজার্ভের পুরো অর্থ উদ্ধার করে বাংলাদেশকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে শুরুতে ফিলিপাইন সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জোরালো সহযোগিতা পাওয়া গেলেও তাদের মনোভাব অনেকটাই পাল্টে গেছে। তদন্ত, অর্থ উদ্ধার, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় চুরি যাওয়া রিজার্ভের বাকী অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয়ে আছে বাংলাদেশ।

অবশ্য বাংলাদেশ বলেছে, চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার করা না গেলে তা রিজাল ব্যাংককে পরিশোধ করতে হবে। কারণ চুরির ঘটনায় রিজাল ব্যাংকের দায় প্রমাণিত। কিন্তু রিজাল ব্যাংক তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছে, অর্থচুরির দায় তাদের নয়। এই দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের। এজন্য রিজাল ব্যাংক ড. ফরাসউদ্দিন কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছে।

চুরি হওয়া রিজার্ভের বাকী অর্থ ফেরত পাওয়া প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির জানিয়েছেন, ফিলিপাইনের চলমান নানা আইনী প্রক্রিয়ার কারণে বাকি অর্থ ফেরত পেতে দেরি হচ্ছে। গত রোববার মুদ্রানীতি ঘোষণার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেছেন। গভর্নর আশাবাদী, সব অর্থই ফেরত পাওয়া যাবে।

গভর্নর জানিয়েছেন, দেশটির নিম্ন আদালতের একটি আদেশে আরো ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার ফেরত পাওয়ার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তা ফিলিপাইনের সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে স্থগিত হয়ে আছে। তিনি জানান, বাংলাদেশের হয়ে ফিলিপাইনের বিচার বিভাগ আরো কয়েকটি মামলা পরিচালনা করছে। সেসব মামলার নিষ্পত্তি হলে চুরি যাওয়া রিজার্ভের বাকি ৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলারও ফেরত পাওয়া যাবে। তিনি দাবি করেন, চুরি যাওয়া রিজার্ভের পুরোটারই হদিস মিলেছে। যদি কোনো কারণে কিছু অর্থের হদিস নাও মেলে, সেক্ষেত্রে ফিলিপাইনের অভিযুক্ত রিজাল ব্যাংককে তা পরিশোধ করতে হবে।

print