আরো মানকাড হওয়া উচিত: ইয়ান চ্যাপেল

স্পোর্টস রিপোর্টার: অশ্বিন বোধহয় একটু হাপ ছেড়েই বাঁচলেন। পুরো ক্রিকেটবিশ্ব যখন তার মুন্ডুপাত করছে, তখন পাশে পেলেন ইয়ান চ্যাপেলের মতো বড় ক্রিকেটবোদ্ধাকে। ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে এক কলামে চ্যাপেল অশ্বিনের পক্ষে কথা বলেছেন। সেই কলামের নির্দিষ্ট অংশ তুলে ধরা হলো এখানে:

ইয়ান চ্যাপেল:

আবারো একই ঘটনা। ক্রিজের বাইরে থাকা ব্যাটসম্যান জস বাটলারকে মানকাড করলেন বোলার রবিচন্দ্রন অশ্বিন। অশ্বিন কিন্তু নিয়মের মধ্যেই ছিলেন। কিন্তু সবসময়ের মতো এবারও বোলারকেই বানিয়ে দেয়া হলো ভিলেন।  

বেশির ভাগ মানকাড আউটেই ব্যাটসম্যানরা ক্রিজের বাইরে বেরিয়ে সুবিধা নেওয়া চেষ্টা করেন, যেটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু তারপরও আইন মেনে তাঁকে আউট করা বোলারকেই খলনায়ক বানিয়ে দেওয়া হয়। বোলার বল করার আগেই একজন ব্যাটসম্যান এগিয়ে থেকে তাঁর দলকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এনে দিতে পারেন বিশাল সুবিধা। দীর্ঘ সংস্করণেও এটা সাহায্য করতে পারে। মেলবোর্নে ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে অ্যালান বোর্ডার-জেফ টমসনের জুটিটার কথাই মনে করে দেখুন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়াকে জয় থেকে মাত্র ৩ রানের দূরত্বে নিয়ে গিয়েছিল ওই জুটি। অথচ ৯ উইকেট যখন পড়ে তখনো অস্ট্রেলিয়া জয় থেকে ৭৪ রান দূরে। টমসন তাঁর স্বাভাবিক গতির চেয়ে একটু বেশি দৌড়ে, প্রতিবারই প্রায় ১ মিটারের মতো এগিয়ে থেকে ১ রানকে ২ রান বানিয়েছে এবং বোর্ডারকে স্ট্রাইক দিয়েছে। একজন খেলোয়াড়ের ব্যাটিং–সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, এমন পরিস্থিতিতে এটা বিশাল সুবিধা এনে দিতে পারে। বাড়তি রানগুলো সীমিত ওভারের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ম্যাচে হয়ে যেতে পারে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং একজন ব্যাটসম্যান যদি এ রকম সুবিধা নিতে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারেন, তাঁকে সেটা করতে বাধা দেওয়ার জন্য বোলারের সমালোচনা কেন করা হয়? এমসিসির এক বোদ্ধা বলছেন, অশ্বিন বনাম বাটলার ঘটনায় বোলারের আচরণ ক্রিকেটের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। বাহ্, তাহলে মানকাডকে বৈধতা দেওয়া আইনটা কেন আছে?

আর যাঁরা বলছেন, এভাবে আউট করার আগে ব্যাটসম্যানকে সতর্ক করা উচিত ছিল, তাঁদের প্রশ্ন করছি, আইনে এ কথা কোথায় লেখা আছে?

যে লোকটা প্রতারণা করছে, তাকে আগে সতর্ক করা উচিত বোলারের! তাহলে চাকিংয়ের জন্য কোনো বোলারকে নো ডাকার আগে তাকে কি সতর্ক করা উচিত আম্পায়ারের?


ম্যাচ শেষে কনফারেন্সে নিজের মত দিচ্ছেন অশ্বিন।

এমসিসির বোদ্ধা এরপর বলেছেন, আধুনিক যুগের ব্যাটসম্যানরা বল ডেলিভারি হলো কি না, এটা দেখার জন্য বোলারের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকেন না, কারণ এতে স্ট্রেট ড্রাইভে হঠাৎ করে চোট পেয়ে যেতে পারেন তাঁরা। হাস্যকর! আমি সব সময় ক্রিজ ছাড়ার আগে বল ডেলিভারি হলো কি না নিশ্চিত করেছি এবং তাতে একবারও অন্য প্রান্তে বল পড়াটা আমার চোখ এড়াতে পারেনি। ব্যাপারটা খুব সহজ, বোলার বল ছাড়ার আগে যদি আপনার ব্যাট ক্রিজের বাইরে না যায়, আপনি কখনো মানকাডেড হবেন না।

আর এত কাছ থেকে বল করার সময় বোলারের হাত দেখাটা ব্যাটসম্যানকেও তো সাহায্য করতে পারে। কোন বলটা সে স্লোয়ার দিচ্ছে, কোনটা টার্ন করাচ্ছে, এটা ব্যাট করার সময় কাজে দিতে পারে।

আমি ও আমার ভাইয়েরা খুব ভাগ্যবান যে আমরা এমন একজন বাবা পেয়েছিলাম—মার্টিন, যিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং খেলাটা সম্পর্কে যাঁর জ্ঞানও খুব ভালো ছিল। তিনি সব সময় আমাদের কানে মন্ত্র পড়ে গেছেন, ‘কঠিনভাবে খেলবে, একই সঙ্গে ন্যায্যভাবেও।’

এই আউট নিয়েই এত বিতর্ক!

যখন আমি ছোট, মার্টিনের অধিনায়কত্বে একটা দলের হয়ে খেলছিলাম। প্রতিপক্ষের একজন ‘হ্যান্ডলড দ্য বলে’র কারণে আউট হলেন। বাড়ি ফেরার পথে মার্টিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই আউটটা সম্পর্কে তোমার কী মত?’

আমি বললাম, ওই তরুণ খেলোয়াড় অবশ্যই আউট, কারণ গড়িয়ে স্টাম্পের দিকে যেতে থাকা বলটাকে সে হাত দিয়ে থামিয়েছে। ‘একদম ঠিক বলেছ’ মার্টিন আমাকে বললেন, ‘আর আমি চাই না তুমি কখনো এভাবে আউট হও।’ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, আমি যদি ব্যাট করার সময় কখনো হাত দিয়ে বল না ধরি তাহলেই তাঁর এই নির্দেশ মেনে চলতে পারব। মার্টিন আমাকে কখনো বলেননি, কিন্তু আমি নিশ্চিত আমি কখনো মানকাডেড হয়েছি শুনলে তিনি মুষড়ে পড়তেন। ফলে আমি সারা জীবন ক্রিজ ছাড়ার আগে বোলার বলটা ছেড়েছে কি না, নিশ্চিত হয়েছি।

এটা খুব দুঃখজনক যে ভিনু মানকড়ের মতো একজন দারুণ ক্রিকেটার, যিনি ক্রিকেটের আইনের মধ্যে থেকেই ১৯৪৭-৪৮ মৌসুমে বিল ব্রাউনকে আউট করেছিলেন, তাঁর নামটা এমন একটা আউটের সঙ্গে জড়াল, যেটা খুব বিতর্কিত হয়ে গেছে। মানকড়কে এই বিতর্কের বাইরে রাখা উচিত।

সময় এসেছে ব্যাটসম্যানদেরও নিজেদের উইকেটটার মূল্য বোঝার এবং বোলার বল ছাড়ার আগ পর্যন্ত ক্রিজে থাকার। এই বোধটা আসার জন্য যদি নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে এ রকম আরও কিছু আউটের দরকার হয়, সেটা খারাপ নয়।

print