ক্রুসে ক্রুসিফাইড সুইডেন

রাহিন ফাইয়াজ: ইংরেজিতে একটি কথা আছে। ‘লিভ টু ফাইট অ্যানাদার ডে’। মানে, আরেকদিন লড়াই করতে বেঁচে থাকা। মাঠে নামার আগে এই মন্ত্রই শীষ্যদের কানে জঁপে দেয়ার কথা জোয়াকিম লোয়ের। কিন্তু সুইডেন জার্মানির সেই বেঁচে থাকার আশা প্রায় ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। দিয়েছিল বলতে, ৯৫ মিনিট পর্যন্ত দুই দল সমতায় থাকায় জার্মানিকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল প্রায় সবাই। কিন্তু জার্মানি আক্রমণ থেকে পিছু হটে নি। জার্মানিকে ঠেকাতে সুইডেন সেসময় এতটাই বেপরোয়া ছিল বক্সের সামনে ফাউল করে বসে মার্কো রয়েসকে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল, জার্মানির একজন টনি ক্রুস আছে। সেই ক্রুসেই ক্রুসবদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়তে হলো সুইডেনকে।

এই জয়ে বিশ্বকাপ আশা বেঁচে থাকলো জার্মানির। সুইডেনের সমান তিন পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের তিনে তারা। নিজেদের আগামি ম্যাচে কোরিয়াকে হারাতে পারলে, এবং মেক্সিকো সু্ইডেনকে হারিয়ে দিলে নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে যাবে তারা। এমনকি মেক্সিকো সুইডেনের ম্যাচ ড্র হলেও জার্মানিই পা রাখবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। কিন্তু সু্‌ইডেন মেক্সিকোকে হারিয়ে দিলে তিন দলেরই পয়েন্ট সমান হয়ে যাবে(৬)। তখন করতে হবে নেট গোলের হিসাব।

জার্মানি ২-১ সুইডেন

৯৫ মিনিটে ক্রুসের সেই গোলটি না হলে অসাধারণ ফুটবল খেলেও বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হতো জার্মানিকে। পুরো ম্যাচেই নান্দনিক ফুটবল খেলেছে জার্মানরা। ছোট ছোট পাস, লম্বা ক্রস, গোছানো আক্রমণ সবই ছিল জার্মানদের খেলায়। কিন্তু আগেই লিখেছিলাম, বড় দলগুলোকে আটকাতে এবার প্রতিটি দলই একই ট্যাকটিকসের সাহায্য নিচ্ছে, বাস পার্কিং। আজকে সুইডেনের সেই বাস পার্কিং যেন আরো প্রকাশ্য। মাঠে স্ট্রাইকার নামে নামলেও ম্যাচের বেশিরভাগ সময় স্ট্রাইকারের দায়িত্ব পালন করেননি কোনো সুইডিশ ফরোয়ার্ড। জার্মানিকে ঠেকাতে নিজেদের অর্ধেই খেলেছে সবাই। ৪-৪-২ এই ফর্মেশনে মাঠে নেমেছিল সুইডেন।

ঠিক এই কারণেই শুরু থেকে ভালো খেলেও প্রথমার্ধের পুরোটা সময় খাঁচায় আটকানো বন্য বাঘের মতো ছটফট করেছে জার্মানি। গোল করতে বেপরোয়া জার্মানি প্রায় পুরো দল নিয়ে আক্রমণে উঠে আসার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বরং এগিয়ে গিয়েছিল সুইডেনই।

৩২ মিনিটে জার্মানির আক্রমণ অসফল হয়ে যখন মাঝমাঠে বল ফিরে এসেছে, ক্রুসের থেকে হঠাতই বল কেড়ে নিয়ে সু্‌ইডিশ মিডফিল্ডার ক্লেসন চমৎকার ক্রসে বলটি বাড়িয়ে দিলেন ততক্ষণে বক্সে ঢুকে যাওয়া টইভোনেনের দিকে। জেরম বোয়েটেংকে পাশ কাটিয়ে দুর্দান্ত চিপে ম্যানুয়েল ন্যায়ের মাথার উপর দিয়ে বলটি জালের কোণে জড়িয়ে দিলেন তিনি। দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে সুইডেনকে এগিয়ে দিয়ে জার্মানির ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচের শুরু থেকে খেলল জার্মানি, কিন্তু এগিয়ে গেল সুইডেন।

সু্‌ইডেন এগিয়ে যেতে পারতো আরো আগেই। ১২ মিনিটে সেই কাউন্টার আক্রমণ থেকে ফরোয়ার্ড মার্কাস বার্গ ঢুকে পড়েছিলেন বক্সে। তাকে থামাতে বেশ জোড়ে ধাক্কা দিয়ে বসেন বোয়েটেং। রেফারি ভিএআরের সাহায্য নিলে পেনাল্টিই পেতো সুইডিশরা।

এরপর বেশ ছন্নছাড়া হয়ে যায় জার্মানি। গোলের আগে জার্মানি চেপে খেলেও গোল পাচ্ছিল না। গোল খাওয়ার পরপর তাদের আক্রমণে উঠার সংখ্যাও কমে যায়। আর গোলে দারুণ উজ্জীবিত সুইডিশরা চেপে খেলা শুরু করে। ৩২ মিনিটের এই গোল থেকে বিরতিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিমল আনন্দ দিয়েছে এই ম্যাচ। সু্‌ইডেনের গতিময় খেলায় বাধা দিতে জার্মানিকেও তখন দেখা যায় পুরো দল নিয়ে পিছিয়ে আসতে।

প্রথমার্ধে ইনজুরিতে পরেন সেবাস্তিয়ান রুডি। সুইডিশ ডিফেন্ডার বুটের আঘাতে নাক থেকে রক্ত ঝরা শুরু করে তার। মাঠে যতক্ষণ ছিলেন, জার্মানিরসব আক্রমণে ভূমিকা ছিল তার। বদলিতে নামেন গুনদোয়ান। মাঠে নেমে অবশ্য তিনি হতাশই করেছেন। ভুল পাসের বাহারই শুধু দেখা গেছে তার পায়ে। জার্মানির অনেক আক্রমণের গতিও হারিয়েছে তার কারণে।

বিরতিতে জোয়াকিম লো খেলোয়াড়দের কি বলে মাঠে পাঠালেন কে জানে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে দুই দলের একেবারেই ভিন্ন চেহারা দেখা গেল। খেলা চলতে লাগলো সুইডেনের অর্ধেই। এবং সমতাসূচক গোলটাও চলে এলো এবার। ক্রুসের বাড়িয়ে দেয়া বল ঠিকমতো ছুঁতে পারলেন না ড্রেক্সলার। তিনি বল সামলাতে না পারাতেই সেই বল চলে যায় পিছে থাকা মার্কো রয়েসের কাছে। গোলপোস্টের এত কাছে থেকে রয়েস সেই বল জালে ঢুকাতে কোনো ভুল করলেন না।

এই গোলের পর একদমই ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে সুইডেন। আক্রমণে তারা এমনিতেও তেমন একটা উঠছিল না। কিন্তু রক্ষণটা সামলে যাচ্ছিল প্রাণের শেষ শক্তিটুকু দিয়েই। গোলের পর সেই রক্ষণেও তারা কেমন যেন শক্তিহীন হয়ে পড়লো। বক্সে সেই পার্কিং করা বাস আর সরেনি, কিন্ত জার্মানির খেলোয়াড়দের পায়ে বল গেলেও কোনো ট্যাকল, কোনো প্রেসিংয়ে দেখা যায়নি তাদের। বেশ কয়েকবার সুযোগ পেয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে উপরে উঠলো না দলটি। মাঝমাঠে এসে আবার ব্যাকপাসে সেই গোলকিপার পর্যন্ত বল টানতে অনেকবার দেখা গেছে সু্‌ইডিশদের।

জার্মানি খেলায় দাপট ছড়ালেও বেশ মারকুটে ভঙ্গিতেই ম্যাচ খেলেছেন জেরোম বোয়েটেং। দুবার হলুদ কার্ড দেখা মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। সু্ইডেন তাদের প্রাপ্য পেনাল্টিটা পেয়ে গেলে হয়তো আজ জার্মানির হারের অনেকটা দায়ভারও নিতে হতো তাকে। এই বিশ্বকাপের এটাই প্রথম সেন্ট অফ।

সুইডেনের এই ছন্নছাড়া অবস্থা কাজে লাগাতে পারেনি জার্মানরা। ম্যাচের বাকি সময়টা একের একের পর আক্রমণে শুধু চেষ্টাই করে গেছে তারা। লাভ হয়নি। সুযোগ পেয়েই বাইরে বল পাঠানো, আর সুইডিশ গোলকিপার রবিন ওলসেনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ানোতে সেই কাঙ্খিত গোলের দেখা পায়নি তারা।

অবশেষে যখন সেই গোল এল, তখন ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইনজুরি টাইমেও সময় নষ্ট হওয়াতে তখনো বাঁশি বাজাননি রেফারি। রয়েসকে ফাউল করে জার্মানিকে ফ্রিকিক উপহার দেয় সু্‌ইডিশরা। রিয়াল মাদ্রিদের জন্য ধারাবাহিকভাবে যা করেন, দেশের জন্য আজ সে সুযোগ পেয়ে ভুল করলেন না ক্রুস। তার অসাধারণ বাক খাওয়ানো শট জালে জড়িয়েই যেতে তিনি হয়ে গেলেন জাতীয় বরপুত্র। আর তার বরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকিয়ে রাখলো জার্মানিও।

print