খাঁদের কিনারায় আর্জেন্টিনা

রাহিন ফাইয়াজ: ম্যাচ তখন শেষ। ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়রা যখন উদযাপনে মত্ত, তখন অতি তাড়াতাড়ি মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলেন আর্জেন্টাইন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি। তার পরপরই কারো সাথে হাত না মিলিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলেন মেসিও। মেসি তো তাও নিজেকে ধরে রাখতে পেরেছেন। সাম্পাওলি দেখে এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল চোখের পানিই হয়তো সামলাতে পারবেন না তিনি। বিশাল জয়ে ক্রোয়েশিয়া শুধু ইতিহাসই তৈরি করেনি, আর্জেন্টিনা দলের মানসিক ভিতেও কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।

দিনের আগের দুটো ম্যাচের একঘেয়েমিতে ভরা ছিল বলেই হয়তো এই ম্যাচটি দিল দুহাত ভরে। যারা আর্জেন্টিনার ম্যাচ না দেখেই ঘুমোতে চলে গেছেন, তারা খুব সম্ভবত বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্দান্ত অঘটনগুলির একটি দেখতে পারেননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকায় আর্জেন্টিনা আর ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের এই স্কোরলাইন বিশ্বাস করতে হয়তো বেশ কয়েকবার চোখ কচলাতে হবে তাদের।

আর্জেন্টিনা ০-৩ ক্রোয়েশিয়া

যোগ্য দল হিসেবেই এই জয় পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া। পুরো ম্যাচেই আর্জেন্টিনাকে নাস্তানাবুদ করেছে তারা। রক্ষণের অতি শিশুতোষ ভুলে দুটি গোল হজম করেছে সাম্পাওলির দল। প্রথম গোলটির জন্য হয়তো জীবনভর প্রায়শ্চিত্তই করে যেতে হবে গোলকিপার কাবেলিরোকে। ওটামেন্ডির পাস নিয়ে বল দূরে পাঠাতে গিয়ে পাঠিয়ে দিলেন ঠিক সামনেই থাকা ক্রোয়েশিয়ান প্লেমেকার রেবিচের কাছে। উড়ে আসা বলটিকে অ্যাসিস্ট বানিয়ে ভলিতে বল জালে জড়ালেন রেবিচ।

সেই গোলের পরই ম্যাচে একটু আর্জেন্টাইন আধিপত্য দেখা যায়। জমে উঠে পুরো ম্যাচ। তবে কিছুতেই হার মানবেন না, এই পণ করে আর্জেন্টিনা খেলতে শুরু করলেও বলের থেকে ক্রোয়েশিয়ান খেলোয়াড়দের পা নিয়েই বেশি খেলতে দেখা গেছে তাদের। সেই কারণে উত্তাপ ছড়ায় পুরো ম্যাচেই, যা থাকে ম্যাচের শেষ গোলটি পর্যন্ত। অনেকবার প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে গেছেন দুই দলের খেলোয়াড়রা।

তবে আফসোস, ম্যাচে উত্তাপ ছড়াতে যতটা পরিশ্রম করেছেন মাসচেরানো-ওটামেন্ডিরা, গোল করতে ততটা পরিশ্রম করেনি পুরো দল। তার কারণেই গোল করা তো দূরের কথা, ৮০ মিনিটে আবারো গোল খেয়ে বসে তারা। ডি বক্সের অনেক বাইরে থেকে লুকা মডরিচের অসাধারণ শটে বাক খেয়ে বল ঢুকে যায় জালে।

এরপরই হাল ছেড়ে দেয় আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয় গোলটি হওয়ার পরই যখন রিপ্লেতে তাদের মুখ এসেছে, তখনই বোঝা গেছে এই ম্যাচের সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন তারা। ছন্নছাড়া ফুটবল খেলতে থাকেন মেসিরা। একটি গোল পরিশোধের আশাতে পুরো দলই উঠে আসে আক্রমণে। সেই সুযোগে কাউন্টার অ্যাটাকে রেবিচ ঢুকে পরেন আর্জেন্টিনার ডি বক্সে। কাবেলিরো প্রথমে তার শট ঠেকিয়ে দিলেও আবারো বল পান তিনি। কিন্তু এবার শট না নিয়ে পাস দিলেন রাকিতিচকে। রাকিচিত যখন ফাকা পোস্টে বল ঢুকানোতে ব্যস্ত, তখন তাকে তার মতো ছেড়ে দিয়ে আর্জেন্টাইন সব ডিফেন্ডার ডি বক্সের বাইরে দাঁড়িয়ে অফসাইডের আবেদনে হাত নাড়ছেন। তাদের নাকের নিচ দিয়ে ততক্ষণে তৃতীয় গোলটি দিয়ে বেরিয়ে গেছে ক্রোয়েশিয়া। এমন মজার গোল হয়তো বিশ্বকাপের ইতিহাসে কমই দেখা গেছে।

চরম চাপ মাথায় নিয়ে এই ম্যাচ খেলতে নামা আর্জেন্টিনার কোচ সাম্পাওলি বড় বড় সব বদল এনেছিলেন একাদশে। ডি মারিয়াকে না খেলিয়ে খেলিয়েছেন মেজাকে। তবে আজও সুযোগ পাননি দিবালা। ম্যাচের ৮০ মিনিটে পেরেজের বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছেন তিনি। একাদশে বদল এনেও লাভ হয়নি। মেজা কিংবা পেরেজ, কেউই কোচের মুখ উজ্জ্বল করতে পারেননি। মেজা তো প্রথমার্ধে ফাঁকা পোস্ট পেয়েও বল গড়িয়ে দিলেন পোস্টের বাইরে।

আশা মেটাতে পারেননি লিওনেল মেসিও। আগের ম্যাচের পেনাল্টি মিসের হতাশা কাটিয়ে উঠে এই ম্যাচে নতুন ঝলকে দেখা দেয়ার বদলে মাঠে বেশিরভাগ সময়ই হাটতে দেখা গেছে তাকে। পায়ে তেমন বলই পাননি তিনি। যা পেয়েছেন, তাতেও একক নৈপুন্যে যে এগোতে পেরেছেন তা নয়।

ভালো পরিমাণেই সুযোগ পেয়েছে আর্জেন্টিনা। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি কোনোটিকেই। মেসি-আগুয়েরো-দিবালা বিশ্বের সেরা সব স্ট্রাইকারদেরকেই খেলিয়েছেন সাম্পাওলি। এত শক্ত আক্রমণভাগও নিয়েই ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণ চিড়তে পারেনি তারা। একটু-আরেকটু যা পেরেছিল, তা নষ্ট করেছে নিজেদের দোষেই।

কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ – কথাটা বোধহয় এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। আগের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। অনেক আশা নিয়ে ব্রাজিলে খেলতে গেলেও চরম আশাভঙ্গ হয়েই ফিরতে হয়েছিল তাদের। সেই ক্রোয়েশিয়া এবার নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচেই শেষ ষোলতে এক পা দিয়ে ফেলেছে। বড় জটিল সমীকরণের প্যাচে না পড়লে পরের রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিতই তাদের।

সেখানে আগের ম্যাচে ড্রয়ের পর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে এই পরাজয়। প্রায় ২০০২ বিশ্বকাপের পর এবার ১৬ বছর পর আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়ার খাঁদে এসে দাঁড়িয়েছে। মেসির শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে  যেই আর্জেন্টিনার পুরো দল শুধু মেসির জন্যেই খেলবে বলে রাশিয়ায় পা রেখেছিল, তাদেরকেই হয়তো সর্বপ্রথম বড় দল হিসেবে বিদায় নিতে হবে এই মহারণ থেকে।

print