দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা

রাহিন ফাইয়াজ: খেলা শেষে জন অবি মিকেলকে ক্যামেরায় ধরা হলো। কোনো মতে কান্না চেপে অধিনায়ক যা বললেন তার অর্থ এই দাঁড়ায়, দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়াটা হয়তো নাইজেরিয়ার ভাগ্যেই ছিল না। কথাটা সত্যিই। ড্র করলেই হতো। নাইজেরিয়া ১-১ স্কোরটা ধরেও রেখেছিল ৮৫ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু ফুটবল বিধাতা বোধহয় মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে ছাড়া বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডগুলো চাননি। তাই প্রাণপনে খেলেও মার্কোস রোহোর গোলটা ঠেকাতে পারলো না নাইজেরিয়া। নিশ্বাস আটকে বসে থাকার মতো ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে পরের রাউন্ডে উঠে গেছে আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে দারুণ সমালোচিত আর্জেন্টাইন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি নিজের উপর সব দায় নিয়ে নিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ভুল কৌশলে দলকে খেলিয়েছেন তিনি, স্বীকার করলেন। ক্ষমা চাইলেন সবার কাছে এবং জানিয়ে দিলেন, জীবন-মরণের এই ম্যাচে একই ভুল করতে রাজি না তিনি। মিথ্যা বলেননি সাম্পাওলি। তার প্রমাণ প্রথমার্ধ থেকেই দেয়া শুরু করলো আর্জেন্টিনা। ৩ মিনিটের মাথায় প্রথম আক্রমণ, তা চলল টানা বিরতির আগ পর্যন্ত।

ফর্মে ফিরলেন মেসিও। ১০ মিনিট থেকেই নাইজেরিয়ার রক্ষণ দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। এবং সমালোচকদের মুখ বন্ধ করানোর মতো গোল করে এগিয়েও দিলেন আর্জেন্টিনাকে। এভার বানেগার লম্বা লং পাসটি ঠিক ডি বক্সের সামনে দুই নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডারের ফাঁক দিয়ে রিসিভ করে অসাধারণ ফিনিশিংয়ে জড়ালেন জালে। গোলের পর যেভাবে দৌড়ে গিয়ে হাটু দিয়ে মাঠের উপর বসে উদযাপন করলেন। বোঝা গেল কতটা চাপমুক্ত হয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যখন বিশ্বকাপে গোল পেলেন মেসি, এবং সেটিই হয়ে দাঁড়াল রাশিয়া বিশ্বকাপের ১০০তম গোল।

আগের ম্যাচে যেই নাইজেরিয়াকে কোস্টারিকার বিপক্ষে দেখা গিয়েছিল, প্রথমার্ধে তেমন খেলতে পারেনি তারা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আক্রমণে সফল হওয়া কঠিন, তবে রক্ষণেও বেশ অগোছালো মনে হতে লাগলো তাদের। তবে আশার কথা এই, বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি দল বড় দলগুলোকে আটকাতে যেই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, সেই বাস পার্কিং আজ দেখা যায়নি নাইজেরিয়ার খেলায়। দ্বিতীয়ার্ধেও যখন তাদের রক্ষণ শেষ পর্যন্ত দানা বেঁধেছে, তখনও ডি বক্সে সবাইকে দাঁড়া করিয়ে খেলার সৌন্দর্য নষ্ট করতে দেখা যায়নি তাদের।

প্রথমার্ধে দুর্দান্ত খেলেছেন এভার বানেগা এবং অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াও। বারবারই নাইজেরিয়ান ডিফেন্স চিরে আক্রমণ চালিয়েছেন তারা।

তবে নাটকের আরো অর্ধেক অংশ তখনো বাকি। হাফটাইম থেকে ফিরতে যেন অন্য দল নাইজেরিয়া। এবার অনেক গোছানো, সুশৃঙ্খল। আর্জেন্টিনার আক্রমণগুলো দুর্দান্তভাবে সামলাতে শুরু করে তারা। এবং তার সাথে কাউন্টারে পাল্টা হামলাও চালাতে লাগলো। এবং আর্জেন্টিনা ভুলটা করলো তখনই।

বিরতি থেকে ফেরার পর মাত্র চার মিনিট পরেই কর্নার পায় তারা। হাভিয়ের মাসচেরানো নাইজেরিয়ান মিডফিল্ডার বালুগানকে হাত ধরে টানতে টানতে এক পর্যায়ে ফেলেই দেন। ভিএআরের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত আসে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত। এবং আর্জেন্টিনার সবে অভিষিক্ত গোলকিপারকে ঘোল খাইয়ে গোলও করে ফেলেন ভিক্টর মোজেস।

এরপর খেলায় আরো গোছানো হয়ে উঠে নাইজেরিয়া। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত শক্ত রক্ষণ, দুর্দান্ত ইন্টারসেপশন, কিছু অসাধারণ কাউন্টারের কারণেই এই পরাজয়কে তাদের জন্য দুর্ভাগ্য বলতে হচ্ছে। বেশ কঠিনভাবেই মেসিদের আটকে রেখেছিল তারা। আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে একটু হাপিয়ে উঠা ডি মারিয়াকে উঠিয়ে নেন সাম্পাওলি, নামিয়ে দেন বেঞ্চে বসে থাকা আগুয়েরোকে।

এর মাঝে রচিত হয় আরেকটি নাটক। কাউন্টারে হঠাতই এগিয়ে যায় নাইজেরিয়া। প্রায় ফাঁকা ডি বক্সে ….কে ক্রস দেন আহমেদ মুসা। ক্রস ঠেকাতে লাফিয়ে উঠেন গ্যাব্রিয়েল মারকাদো। তার মাথায় বল লাগার পর নিচে নামার সময় আলতো ছোঁয়া পায় হাতেরও। মাথায়-হাতে লেগে বলটা চলে আসে আবার ওগেনেকারো এতেবোর কাছে, কিন্তু তিনি শটটি মারেন বাইরেই। গোল করার দুর্দান্ত সুযোগ নষ্ট করলেও সাথেই সাথেই দাবি তুলেন পেনাল্টির। কিন্তু ভিএআরে পরিষ্কার হাতে লাগার বিষয়টি দেখা গেলেও পেনাল্টি দেন নি রেফারি। তার দাবি, মাথায় লেগে হাতে লেগেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে। তাই পেনাল্টি হওয়ার সুযোগই নেই।

সেই কথাই হয়তো সবাই মেনে নিতো। কিন্তু এত সহজে মেনে নেয়া যাচ্ছে গতকালকেও প্রায় একই রকম হ্যান্ডবলে ইরান পর্তুগাল ম্যাচে ইরান পেনাল্টি পাওয়ার কারণে। ইরানিয়ান স্ট্রাইকারের মাথায় লেগে বলটি লাগে পেপের হাতে। অনিচ্ছাকৃতভাবেই। কিন্তু সেটিকেই পেনাল্টি দেয়া হয়। এবং সেখান থেকে ম্যাচে সমতাও আনে ইরান।

শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ড্র হলে এই পেনাল্টি নিয়ে আর কথাই হয়তো হতো না। কিন্তু নাইজেরিয়া বাদ পড়াতে এখন কি হলে হতো, সে বিষয়ে কথা আসবেই। তাই এই বিশ্বকাপেই বেশ কয়েকবার বির্তকিত রেফারিং হওয়ার পর আবারো হয়তো কঠোর সমালোচনাতেই পরতে যাচ্ছে ফিফা।

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন মার্কোস রোহো এবং নাইজেরিয়ার এক মুহুর্তের ভুল। দ্বিতীয়ার্ধে কোনোবারই ডি বক্স খালি রাখেনি নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডাররা। একবারই রাখলেন, ৮৫ মিনিটে। আর রোহোর ম্যানমার্কার কেন যেন তাকে বেশ ফাঁকা জায়গা দিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই সুযোগটাই নিলেন রোহো। হিগুয়েনের দুর্দান্ত ক্রসটিকে দারুণভাবে জালে জড়ালেন তিনি।

কান্নাভেজা চোখেই রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল নাইজেরিয়া। দ্বিতীয় রাউন্ডে না উঠতে পারা তাদের নিদারুণ দুর্ভাগ্যই বলতে হয়। আর আর্জেন্টিনাও ধন্যবাদ জানাতে পারে নিয়তি এবং রোহোকে।

print