চ্যাম্পিয়নশিপের অভিশাপে আটকা জার্মানিও!

রাহিন ফাইয়াজ: ২০০২, ২০১০, ২০১৪। এই তালিকায় আরো একটি সাল যোগ করে নিন। ২০১৮। আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা এই সালগুলোতে পরের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের থেকেই বিদায় নিয়েছে। কোরিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে জার্মানিও প্লেনের টিকেট কাটলো। চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাকে কি এখনো অভিশাপ মনে হচ্ছে না?

দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে জার্মানিকে জিততেই হতো। ম্যাচ সমতায় চলাতে ৯০ মিনিটেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ, একই সময়ের অপর ম্যাচে মেক্সিকোকে ৩-০ গোলে ততক্ষণে হারিয়ে দিয়েছে সুইডেন। দেশে ফিরে যাওয়া থেকে বাঁচতে হলে ৬ মিনিটে ৫টা গোল দেয়া লাগতো জার্মানির, যা এর আগে কখনো ফুটবল ইতিহাসে দেখা যায়নি। তবে এত সহজে জার্মানি ঘরে ফিরবে, তা বোধহয় মানতে পারলো না কোরিয়া। জয় ছাড়া এই বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ করলো না তারা।

কিন্তু সেই দুটি গোলও কী অসাধারণ নাটক দেখাল! ৯১ মিনিটে কর্নার পেল কোরিয়া। লি-জে সুংয়ের ক্রসটা তেমন কোনো আহামরি ছিল না। কিন্তু খেলায় যেন তখন মনোযোগই নেই জার্মান ডিফেন্ডারদের। গো ইয়ো হানের পায়ে লেগে জার্মান দুই ডিফেন্ডারের পায়ের ডিফ্লেকশনে বল আসে কোরিয়ান ডিফেন্ডার কিম ইয়াং গোয়নের পায়ে। গোলপোস্টের এত কাছে তখন নয়্যারও অসহায়। তবুুও পা বাড়িয়ে দিলেন তিনি। সেই পায়ে লেগে জালের কর্নারের ঢুকে গেল বল।

নাটকের তখনো অনেক কিছু বাকি। কিম ইয়াং উদযাপনের আতিশায্যে দৌড়ে চলে গেলেন লাইনসম্যানের কাছে। আর তখনই হাতের পতাকা উঠিয়ে দিলেন লাইনসম্যান। অফসাইড! হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন জার্মানরা। কিন্তু সেই শান্তি আর বেশিক্ষণ থাকলো না। কোরিয়ার দাবিতে ভিএআরের সাহায্য নিলেন রেফারি। রিপ্লেতে দেখা গেল, হানের পাসটি টনি ক্রসের পায়ে লেগে গেছে। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে কোরিয়া, সেই ঘোষণার সাথে সাথে তাদের উদযাপন ছিল দেখার মতো।

জার্মানি অবশ্য তখনো হাল ছাড়ে নি। কারণ সম্ভবত তারা সুইডেন-মেক্সিকো ম্যাচের ফল তখনো জানতে পারেনি। গোলটি শোধ করতে প্রাণপনে চেষ্টা করতে থাকে তারা। সুযোগও পায়। ৯৪ মিনিটে, কর্নারে। সেই গোল করতে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে তারা, যে ডি বক্স থেকে উঠে আসেন ম্যানুয়েল নয়্যারও। এমনিতে বক্সের বাইরে এসে গোল ঠেকানোতে দারুণ সুনাম নয়্যারের। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইপার উপাধিও পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজ যা হলো, তাতে কি আর কখনো বক্সের বাইরে বের হবেন নয়্যার?

গোলপোস্ট ফাঁকা থাকার সুযোগে নিজেদের পায়ে বল পেয়েই স্ট্রাইকার সন হিউং মিনের দিকে বল ছুড়ে দেয় কোরিয়া। ঠিক সময়ে দৌড় শুরু করা মিনও কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকতে ভুল করলেন না। ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া বুঝি একেই বলে!

অঘটন নয়। আজকের ম্যাচে জয় প্রাপ্য ছিল না জার্মানির। জার্মানি জয় পেয়ে গেলে তা অবিচার হতো কোরিয়ার প্রতিই। প্রথমার্ধেই তিনবার গোলের সুযোগ পেয়েছিল এশিয়ান এই দেশ। নয়্যারের মতো চোস্ত গোলকিপারও ভুল করে ফেলেন তাদের প্রেসিং ফুটবলে। ১৯ মিনিটে ফ্রিকিক থেকে উ-ইয়ং-জাংয়ের শটটি সামলাতে পারেননি নয়্যার। ভাগ্যের কারণেই তখন গোলটি দিতে পারেনি কোরিয়া।  এরপরেও সুযোগ পেয়েছিল কোরিয়া, কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের আগে নষ্ট করেছে সবগুলোই।

একের পর এক সুযোগ নষ্ট করেছে জার্মানরাও। লিও গোর্তেকার একটি হেডে দারুণভাবে সেভ করেন চো হিউন-উ। ম্যাট হামেলস, ভের্নার ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগেও সহজ সব গোলের সুযোগ নষ্ট করেছেন। গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন গোমেজ-ওজিলরাও। কিন্তু আজ বাজে খেলেই হেরেছে জার্মানরা।

এই প্রথম গ্রুপপর্ব থেকেই বাদ পড়ল জার্মানি। আজকের পরাজয়ে গ্রুপের চতুর্থ এবং সবচেয়ে বাজে দল হিসেবেই দেশে ফিরতে হলো তাদের। একই সমান পয়েন্ট নিয়ে নেট গোলে এগিয়ে থাকাতে তৃতীয় হয়ে বিশ্বকাপ শেষ করেছে কোরিয়া। সু্‌ইডেনের কাছে হেরে গিয়ে রানার্সআপ হিসেবে গ্রুপ এফ থেকে রাউন্ড অফ সিক্সটিন খেলবে মেক্সিকো। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন সু্‌ইডেন।

এই নিদারুণ অঘটনে বিশ্বকাপ অনেকটাই রং হারাবে। ফুটবলপ্রেমিরা মিস করবেন দ্বিতীয় রাউন্ডে হলেও হতে পারতো ব্রাজিল-জার্মানি ম্যাচটা। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ব্যর্থতায় বিশাল অদবদল আসবে জার্মান ফুটবলে।

print