বেঁচে গেল ব্রাজিল

রাহিন ফাইয়াজ: উপরের ছবিটি বড় ভুল বার্তা দিচ্ছে। এটি আনন্দের অশ্রু। কিন্তু ৯১ মিনিটে কুতিনহো গোলটি না দিলে। এবং ম্যাচ ৯৬ মিনিটেই শেষ হয়ে গেলে, হয়তো এই ছবিটির ভুল বার্তাই সত্য হয়ে যেত। পরপর দুই ম্যাচে ড্র করলে যে ব্রাজিলের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠায় অনিশ্চিত হয়ে যেত। ৯০ মিনিট পর্যন্ত ব্রাজিলকে আটকে রেখেছিল কোস্টারিকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইনজুরি সময়ের দুই গোলে পরাজয় বরণ করে মাঠ ছেড়েছে তারা। এই হারে বিশ্বকাপ থেকে কোস্টারিকার বিদায়ও নিশ্চিত হয়ে গেল।

ব্রাজিল ২-০ কোস্টারিকা

কয়েক বছর আগে হোসে মরিনহো চেলসির কোচ থাকার সময় যখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ঠিকমতো বাস পার্কিং পদ্ধতি ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন, তখন তা নিয়ে সমালোচনায় মত্ত হয়ে উঠেছিল পুরো বিশ্ব। এবার বিশ্বকাপে বড় দলগুলোকে আটকানোর জন্য এই পদ্ধতিরই ব্যবহার করেছে সবগুলো ছোট দল। খেলার সৌন্দর্য হারালেও সাফল্য এসেছে। ডি বক্সের ভেতর প্রতিপক্ষের বেশিরভাগ খেলোয়াড়কে পার করে তাই বড় দলগুলো গোল করতে পেরেছে কম। ড্র এমনকি বড় বড় অঘটনও দেখা গেছে। আজকেও কোস্টারিকা একই পদ্ধতিতে খেলল। এবং তাতে তারা অসফল, সেটা বললে ভুল হবে। ৯০ মিনিট পর্যন্ত ব্রাজিলকে বোতলবন্দীই করে রেখেছিল তারা।

কোস্টারিকা যেভাবে খেলেছে, আজকে জয়ও পেয়ে যেত পারতো তারা। সেই জয় কতটুকু তাদের প্রাপ্য, সেটা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন উঠতো। কিন্তু জয় তো জয়ই। ৫-৩-২, এই ফর্মেশনে দল নামিয়েছিলেন অস্কার রামিরেজ। কিন্তু সেই ফর্মেশন ভেঙ্গে ম্যাচে কোস্টারিকাকে ৫-৪-১ ফর্মেশনেই খেলতে দেখা গেছে। মাঝমাঠের উপরে একজনকে রেখে নিজেদের অর্ধে এক স্তরে ৪ জন খেলোয়াড় আর কিছুদূর বাদ রেখে ৫ জন খেলোয়াড়, এই তত্ত্বেই ব্রাজিলকে আজ প্রায় হতাশ করে ঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছিল তারা। পুরো ম্যাচটাই ব্রাজিল চেপে খেলেছে। কিন্তু তিনবার কাউন্টারে বেশ সম্ভাবনাময় আক্রমণে এগিয়ে গিয়েছিল কোস্টারিকা। গোল হয়নি ভালো ফিনিশারের অভাবে। অবশ্য তা শুধু ম্যাচের প্রথম দিকে।

ম্যাচের ২৬ মিনিট পর্যন্ত মাঝমাঠই পেরোতে পারেনি ব্রাজিল। গোলে শট নেই একটিও। সেখানে কোস্টারিকা দুটি শটে প্রায়ই গোলই করে ফেলেছিল। শেষ পর্যন্ত ২৭ মিনিটে সেলেকাওরা চিড়তে পারে কোস্টারিকান ডিফেন্স। কিন্তু মার্সেলোর শটটি গোলবারের অনেক উপর দিয়েই যায়। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই আবার ডি বক্সে ব্রাজিল। এবার কুতিনহোর থ্রুতে গোলও করে ফেলেন গ্যাব্রিয়েল জেসুস। কিন্তু সেই গোল বাতিল হয়ে গেল পরিষ্কার অফসাইড হওয়ার কারণে।

৩১ মিনিটের মাঝেই আর তিনবার কোস্টারিকার ডিবক্সে হামলা চালান কুতিনহো-জেসুস-উইলিয়ান-মার্সেলো। কিন্তু লাভ হয়নি। বলতে গেলে ডি বক্সে খেলোয়াড়ের ভিড়ে শট নেয়ারই জায়গা পায়নি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডরা। যতটুকু পেয়েছেন তাতেও গোলপোস্টের বাইরেই মেরেছেন বল। কুতিনহো বক্সের বাইরে থেকেও চেষ্টা করে দেখলেন। আজ তাতেও গোলের দেখা মিলল না।

শুধু বাস পার্কিং নয়। ব্রাজিলের গোল হামলা আজ কোস্টারিকা ঠেকিয়েছে অফসাইড ফাঁদে ফেলেও। ৩টি দুর্দান্ত আক্রমণ পথ হারিয়েছে অফসাইডের কারণে। তিনবার অফসাইড করেছে কোস্টারিকাও। তবে ব্রাজিলের ফাঁদে নয়। নিজেদের দোষেই।

ব্রাজিলকে সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের গোলকিপার কেইলর নাভাসও। কেন কোস্টারিকার সবচেয়ে বড় তারকা একজন গোলকিপার, আজ তা প্রমাণ করেছেন তিনি। একের পর এক শট, সামনে এগিয়ে এসে ক্রস এবং থ্রু বলও ফেকিয়ে দিয়েছেন। ব্রাজিল জিতে না গেলে সম্ভবত ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ তিনিই হতেন। সেই পুরস্কার শেষ পর্যন্ত গেছে কুতিনহোর কাছে।

গোল না পেলেও খেলেছে আসলে ব্রাজিলই। বল দখলের পরিসংখ্যান দেখলেই তা বোঝা যায়। ৭০ ভাগের বেশি বল নিজেদের পায়েই রেখেছে তারা। প্রথমার্ধের ভুল সব কাটিয়ে উঠতে কোচ তিতে দ্বিতীয়ার্ধে পাঁচজন খেলোয়াড় আনলেন শুধু আক্রমণেই। ডিফেন্সে কম খেলোয়াড় থাকার কারণে মার্সেলো একটু কমই উপরে উঠে এসেছেন এই সময়। ৪৫ মিনিটের পর থেকে আর কোনো ছাড় দেয়নি ব্রাজিল। বারবারই ডিফেন্স ভেঙ্গে উঠে এসেছেন তারা। ৭০ মিনিটেও যখন সেই কাঙ্খিত গোল এল না, তখন বেশ শরীরি ভাষায়ও বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন ব্রাজিলিয়ানরা। উত্তাপ ছড়ায় ম্যাচে।

নেইমারকে টার্গেট করে ফাউল করা হয়েছে। কিন্তু যতটুকু হয়েছে, তার থেকে নাটকই করেছেন তিনি। খাঁজনার চেয়ে বাজনা বেশি আরকি। ৭৮ মিনিটে বক্সে কোস্টারিকান ডিফেন্ডার গঞ্জালেজ তাকে ধরার আগেই চিৎকার করতে করতে পরে গেলেন। রেফারিও পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়ে দিলেন। ভিএআরে ধরা পড়ল সেই নাটক। পেনাল্টি বাতিলের পর নেইমারের লজ্জ্বিত হাসিও ধরা পড়ল ক্যামেরায়।

লজ্জার কারণেই কিনা কেমন ক্ষ্যাপাটে মূর্তি ধারণ করলেন তিনি। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এরপর রেফারির সাথে অনেকবার তর্কে জড়িয়েছেন তিনি। ফলে পেয়েছেন হলুদ কার্ডও। তাকে সমর্থন দিতে এসে হলুদ কার্ড পেয়েছেন কুতিনহোও। ম্যাচে বল পায়ের ড্রিবলিং থেকে তাকে বেশিরভাগ সময় এই তর্ক বির্তকেই ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। জাদুকরী ড্রিবলিং তো দূরে থাক, ৯০ মিনিট পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাময় ড্রিবলিংই দেখা যায়নি তার পায়ে। এই নাটকের পর শুধু  নাভাসকে সামনে পেয়েও বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়ে আরেকটি গোল ছুঁড়ে ফেলে এসেছেন তিনি।

উত্তাপ এত ছড়িয়েছে যে ৬ মিনিট অতিরিক্ত সময় দেয়া হয়। আর তারপরই আসে সেই মহাকাঙ্খিত মূহুর্ত। মার্সেলোর ক্রসটি প্রথমে পৌছায় রবার্তো ফিরমিনোর কাছে। তার হেডে জেসুসের ছোঁয়া লাগার সাথে সাথেই চিলের মতো দৌড়ে এসে দারুণ শটে নাভাসের দুপায়ের ফাঁক দিয়ে গোল করে বসেন কুতিনহো। গোলটি ব্রাজিলের জন্য কতটা স্বস্তির হয়ে এসেছিল, তা বোঝা যায় তাদের উদযাপনের আতিশয্যে। তিতে ডাগআউট থেকে দৌড়ে আসতে গিয়ে তো মাঠের মাঝে আছাড়ই খেয়ে বসলেন।

ম্যাচ ৯৬ মিনিটেই শেষ হলে আজ নেইমার দারুণ সমালোচনায় পড়তেন। সমালোচনা এখনো হচ্ছে, কিন্তু ৯৭ মিনিটের ওই গোলই কিছুটা বাঁচিয়ে দিয়েছে তাকে। আবার ফিরমিনোর পাসের পর জেসুসের বানিয়ে দেয়া বলটিকে ট্যাপ ইন করে জালে জড়িয়েছেন তিনি। ম্যাচের গুরুত্বের হিসেবে এই গোল শুধু সংখ্যাই। কিন্তু তাতে তো নেইমারের কাছে এই গোলের গুরুত্ব কমে যায় না। সেই স্বস্তিতেই হয়তো ম্যাচের পরে সেই আবেগাপ্লুত অশ্রু দেখা যায় তার চোখে।

আজ সুইজারল্যান্ড-সার্বিয়া ম্যাচে সার্বিয়া জয় পেয়ে গেলে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে যাবে তারা। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কারণে এখন পয়েন্ট টেবিলে প্রথম স্থানে সেলেকাওরা।

print