মাদ্রিদ ছাড়লেন জিদান

স্পোর্টস রিপোর্টার: ‘এই ঘোষণা দেয়ার জন্য হয়তো সময়টা অদ্ভুত। কিন্তু আমার মনে হয় এটাই ঠিক সময়। তিন বছর অনেক লম্বা সফর। এখন এই ক্লাবের জেতা দরকার, দরকার একটি নতুন আওয়াজের, নতুন নেতৃত্বের। এই কারণেই আমার এই সিদ্ধান্ত।’

সংবাদ সম্মেলনে এই কথাগুলো বলেই সবাইকে চমকে দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার মাত্র পাঁচ দিন পরেই রিয়াল মাদ্রিদের কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন জিনেদিন জিদান। একবিংশ শতাব্দীতে লস ব্ল্যানকোসদের সবচেয়ে সফল কোচ তিনি। সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর তো তিনি এই শতাব্দীরই সবচেয়ে সফল কোচ কিনা, সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। মাত্র আড়াই বছরে ক্লাবকে এনে দিয়েছেন ৯টি শিরোপা। পরপর তিনবার নিজের দলকে ইউরোপ সেরা করার রেকর্ড সমসাময়িক আর কোনো কোচেরই নেই।

জিদানের এই ঘোষণায় চমকে গেছেন স্বয়ং রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনা পেরেজ। এ ব্যাপারে জানতেন না তিনিও। আজকে বিকালেই হঠাৎ জিদানের অনুরোধে সংবাদ সম্মেলন ডাকতে বাধ্য হয় মাদ্রিদ কতৃপক্ষ। সেখানেই জিদান জানিয়ে দেন, এই পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন তিনি।

‘চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর এ রকম কিছু শোনাটা অপ্রত্যাশিত। আমার জন্য এটি একটি খুবই মন খারাপের দিন। এমনকি প্রতিটি মাদ্রিদ-ভক্তের জন্য, প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্যও। আমি তাকে থাকতে বলবো না। আমি জানি সে কিরকম। তবে তার জন্য রইল আমার সবটুকু ভালোবাসা,’ মাদ্রিদ সভাপতি জানান সাংবাদিকদের।

জিদানের সাথে পেরেজের সুসম্পর্ক নতুন কিছু নয়। তিন বছর আগে যখন রাফায়েল বেনিতেজের কোচিংয়ে ডুবতে বসেছিল মাদ্রিদ, ঠিক তখনই জিদানকে সহকারী কোচ থেকে হেডকোচ বানিয়ে দেন পেরেজ। অনভিজ্ঞ জিদান এরকম বাজে ফর্মে থাকা ক্লাবকে কতদূর টানতে পারবেন, সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকেই। কিন্তু সবাইকেই বোকা বানিয়ে রূপকথা লিখতে বসেন জিদান। সে বছরই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে রিয়াল মাদ্রিদ। বছরের অর্ধেক পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার থেকে দশ পয়েন্টে পিছিয়ে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা লা লিগা শেষ করে রার্নাস আপ হিসেবে, বার্সেলোনার থেকে এক পয়েন্ট ব্যবধানে।

এরপরের দুই বছরের ইতিহাস তো সবারই জানা। ক্লাবের হয়ে জেতা যায়, এমন কোনো শিরোপা জয় বাকি রাখেননি জিদান। সবচেয়ে সফল গেছে মাদ্রিদ কোচ হিসেবে তার দ্বিতীয় বছর। এক বছরে টানা ছয়টি শিরোপা জিতেছেন তিনি। সে বছর টানা ৪০ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়ে রিয়াল মাদ্রিদ।

তিন বছরে তিনি জিতেছেন টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটি ক্লাব বিশ্বকাপ, একটি লা লিগা, দুটি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং দুটি উয়েফা সুপার কাপ। এমন সাফল্যের পরও জিদান মনে করছেন, এটাই চলে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কিন্তু কেন?

জিদানের মতে, আগামি বছর তিনি থাকলে হয়তো আর সাফল্য পাবে না মাদ্রিদ। সে প্রমাণ নাকি দেখা গেছে এই বছর ঘরোয়া কাপ ও লিগে মাদ্রিদ সাফল্য না পাওয়াতে। ‘আগামী মৌসুমে এখানে আমি ম্যানেজার থাকলে হয়তো আমাদের জন্য কোনো শিরোপা জেতা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াতো। এ মৌসুমে কোপাতেই দেখেছেন এটা । ঘরোয়া টুর্নামেন্টের কথা ভুলে যাওয়া যাবে না।’

যাওয়ার আগে জিদান জানালেন, আবারো তিনি ফিরতে পারেন মাদ্রিদে। ‘আমি ফিরবো না, এমন কথা বলছি না। কিন্তু আপনাকে জানতে হবে কখন থামতে হয়। আমি সবসময় এই ক্লাবের কাছাকাছি থাকবো, এটা আমার প্রিয় ক্লাব। আমার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত হলো যখন আমি খেলোয়াড় হিসেবে রিয়ালে যোগ দিলাম। খেলোয়াড় হিসেবে এখানে আমার শেষটা ভালো হয়েছে। কোচ হিসেবেও আমি সেভাবেই যেতে চাই।’

এমন খবরে রিয়াল ভক্তরা দারুণ হতাশ। আগামি মৌসুমে জিদানকে ঘিরেই স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। এই গ্রীষ্মে কঠিন পরীক্ষার সামনেই পরে গেল রিয়াল মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পরপরই সে ম্যাচের নায়ক গ্যারেথ বেল জানিয়েছেন, সামনের মৌসুমে ক্লাবে নাও থাকতে পারেন তিনি। পরের দিন দলের প্রাণভোমরা রোনালদাও আগামি মৌসুমে মাদ্রিদে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন। তাকে দলে টানতে কঠিন দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন ফ্রেঞ্চ ক্লাব পিএসজি। রোনালদোর জন্য মাদ্রিদ পেতে পারে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার কিংবা নেইমারের সাথে বদল হতে রোনালদোর, এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। গ্যারেথ বেলকে পেতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড। এমন সময় জিদানের ক্লাব ছাড়ার ঘোষণাকে মাদ্রিদ সমর্থকদের খুব বেশি ভরসা দেয়ার কথা না।

জিদানের উত্তরসূরি কে হবেন, সে বিষয়ে জল্পনা শুরু হয়ে গেছে। এ বছরই আর্সেনাল ছেড়েছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। অভিজ্ঞ এই কোচকে নিয়ে আসতে পারেন পেরেজ। অন্যদিকে আন্তোনিও কন্তে চেলসি ছাড়ছেন, সে গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। কোচ হিসেবে এই ট্যাকটিকসের এই গুরুও চলে আসতে পারেন মাদ্রিদে। তবে মাদ্রিদ ছাড়ার পর জিদান কোচ হিসেবে অন্য কোথাও যাবেন নাকি কয়েকদিন বিশ্রামে থাকবেন, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

মাদ্রিদে জিদান:
ম্যাচ: ১৪৯
জয়: ১০৪
পরাজয়: ২৯
ড্র: ১৬
জয়ের শতাংশ: ৬৯.৮০%
শিরোপা: ৯

print