মিসরের রূপকথার স্বপ্ন মুছে রূপকথা লেখল রাশিয়া

রাহিন ফাইয়াজ: লিভারপুলের হয়ে স্বপ্নগাঁথা লেখেছেন মো: সালাহ। সেই সালাহ্‌র জাদুতেই একই রূপকথা লেখবে মিসর, সেরকমই ভাবা হচ্ছিল। অন্যদিকে, র‍্যাঙ্কিংয়ে ৭০ নাম্বার একটি দল স্বাগতিক বলেই সুযোগ পেয়েছে বিশ্বকাপ খেলার। সৌদি আরবের পর বিশ্বকাপের সবচেয়ে দুর্বল দল। সেই দলই যে নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচে পরপর প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে সবার আগে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়া নিশ্চিত করবে, কে ভেবেছিল? শুরু থেকেই সব ভাবনা-ব্যাখা-বিশ্লেষণকে উল্টেপাল্টে দেয়া এই বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচই একেকটি চমক হয়েই দেখা দিচ্ছে।

রাশিয়া ৩-১ মিসর

প্রথম ম্যাচ খেলেননি। এই ম্যাচেও সালাহ খেলবেন কি খেলবেন না, তা নিয়ে ছিল জল্পনা। শেষ পর্যন্ত একাদশে তার নাম দেখে স্বস্তির নিশ্বাসই ফেলেছিলেন তার নব্যনতুন ভক্তরা। সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ থাকেনি। খেলার শুরু থেকেই রাশিয়া ছড়ি ঘুরিয়েছে মিসরের উপর। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হয়ে উঠার ঝলক দেখাতে পারেননি সালাহ্‌ও। স্তানিস্লাভ চেরচেশভের দল যেভাবে খেলেছে, একবারও মনে হয়নি ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের মাঝে আছে আরো ২৪টি দল।

ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিট মনেই হয়নি, রাশিয়া ছাড়াও খেলায় আছে আরেকটি দল। এই ২০ মিনিটে প্রায় ৯ বার কঠিন সব পাস এবং থ্রুতে মিসরের ডিফেন্স ঘায়েল করে গেছেন ডেনিস চেরিশেভরা। এই সময়ে একাধিক গোলের সুযোগ নষ্টই করে রাশিয়া। ২০ মিনিট পর বল দখলের লড়াইয়ে নামে মিসর। তাতেও লাভ হয়েছে এমন বলা যাবে না। এরপরও ম্যাচে চালকের আসনে রাশিয়া। প্রথমার্ধ জুড়েই এই ইদুর-বিড়াল খেলায় কাটে সময়। একের পর এক আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণের পরও রাশিয়ার গোল না পাওয়াতেই তখন অবাক হতে হচ্ছিল।

মিসর আক্রমণে উঠেনি, তা নয়। কিন্তু রাশিয়ার আক্রমণের জবাবে যখনই মাঝমাঠের উপরে উঠতে গেছে তারা, তখনই প্রায় পুরো দল নিয়ে পিছিয়ে এসেছে রাশিয়া। তখনই আর তল খুঁজে পায়নি মিসর। অ্যাটাকিংয়ে অতিরিক্ত সালাহ নির্ভর হতে গিয়েও অনেক সুযোগ হারিয়েছে তারা। প্রথমার্ধে খুঁজেই পাওয়া যায়নি সালাহকে। মাত্র ১৮ বার পায়ে বল ছুঁয়েছেন তিনি। এর সাথে মিসরের ভুল পাসের বাহার তো আছেই।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সেই গোলখরা কাটিয়ে উঠলো রাশিয়া। তবে সেটা নিজেদের নৈপুন্যের থেকে বেশি মিসরের দয়াতেই। ডান উয়ং দিয়ে আক্রমণে উঠেন গোলোভিন। তার ক্রস মিসরের ডিফেন্ডার ফিরিয়ে দিতেই তা খুঁজে নেন জবনিন। জবনিন শট নিতেই ফাতিহ ঝাঁপিয়ে পরেন সেটা ফিরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায়। তার দুর্ভাগ্য, তার পায়ের ডিফ্লেকশনে বল বাইরে যাওয়ার বদলে খুঁজে নেয় জাল।

এরপরই দল হিসেবে আরো ছন্নছাড়া মিসর। সেই সুযোগে ১৫ মিনিটের ভেতর আরো দুটি গোল রাশানদের। দুর্দান্ত গতির আক্রমণ আবারো ডান উইং দিয়েই এগোলেন উইংগার সামেদভ। সেখান থেকে বক্সের ভেতর পাস মারিও ফার্নান্দেসকে, এবং ফার্নান্দেসের ক্রস থেকেই ডেনিস চেরিশেভের গোল। দুই ম্যাচে তিন গোল করে ফেলা এই স্ট্রাইকার যখন মহাআনন্দে উদযাপনের নামে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। তখন কিভাবে রাশিয়ার গতির সাথে পেরে উঠবে, সেই ভাবনায় আচ্ছন্ন মিসর।

দুই মিনিটের মধ্যেই আবারো গোল। মাঝমাঠেরও বাইরে থেকে উড়ে আসা বলটি পায়ে পেয়ে দুর্দান্ত কন্ট্রোলে সামলালেন স্ট্রাইকার জিউবা। মিসরের ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে ঠেলে শট নিতেই পর্যদুস্ত গোলকিপার।

তারপরই জেগে উঠে মিসর। এবং তাতে জমে উঠে ম্যাচ। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, এক মুহুর্তের জন্যও আর চোখ ফিরানো যাচ্ছিলো না মাঠ থেকে। কিন্তু মিসরের জন্য তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ভালো খেলেও আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি তারা।

বারবার রাশিয়াকে চেপে ধরার ফল হিসেবে আসে ৭২ মিনিটের পেনাল্টিটা। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলের খাতা খুলেন সালাহ।

রাশিয়া একেবারেই দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যায়নি। সমীকরণের মারপ্যাচে এখনও বাদ পরতে পারে তারা। কিন্তু সেটা বেশ জটিল। তার জন্য রাশিয়াকে আগামি ম্যাচে হারতে হবে উরুগুয়ের কাছে, উরুগুয়েকে হারতে হবে সৌদির কাছে। এবং সৌদি আরবকে নিজেদের আগামি দুটি ম্যাচ জিততে হবে ৮ গোলের ব্যবধানে। বিশ্বকাপ যেভাবে এগোচ্ছে, সম্ভব যেকোনকিছুই!

print