রোনালদো রূপকথায় ড্র করলো পর্তুগাল

রাহিন ফাইয়াজ: দৈত্যের হানায় পুরো রাজ্য যখন বিপদে হাবুডুবু, তখনই দেখা দিবেন রাজকুমার। দৈত্যের সাথে লড়বেন তিনি। প্রাণপনে, একাই। কখনো পেছাবেন, কখনো আগাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই দৈত্যের জয় হতে দিবেন না তিনি। চিরচিরায়ত যেকোনো রূপকথার সারাংশ। আজকের ম্যাচেরও কি নয়?

ম্যাচের তখন ৮৮ মিনিট। ম্যাচের স্কোর: স্পেন ৩-২ পর্তুগাল। ঠিক পেনাল্টি বক্সের সামনে ফ্রিকিক পেয়েছে পর্তুগাল। সমতায় ফেরার শেষ সুযোগ এটাই। রোনালদো ফ্রিকিকটি নেয়ার ঠিক আগমূহুর্তে ক্যামেরার ক্লোজ-আপ শটে দেখা গেল তার মুখ। এর আগের দুটি গোলও তার। একটু পরপর মুখ দিয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছেন, চোখ দিয়ে মেপে নিচ্ছেন সবকিছু। অসাধারণ মনোযোগ। ফ্রিকিক নিলেন, এবং সম্ভবত বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো শটগুলোর একটিতে সমতায় ফেরালেন পর্তুগালকে। ডি হায়া শুধু তাকিয়েই রইলেন। ঠিক যেন রূপকথা!

কালকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং রাশিয়া-সৌদি আরবের ম্যাড়ম্যাড়ে ম্যাচের হতাশাটুকু কাটিয়ে দিতেই বোধহয় আজকের স্পেন-পর্তুগাল ম্যাচ দুহাত ভরে দিল ফুটবলপ্রেমীদের। আক্রমণ, প্রতিআক্রমণ, গোলবন্যা, হ্যাটট্রিক, ফাউল, পেনাল্টি, উত্তাপ, কী ছিল না এই ম্যাচে? বিশ্বকাপের ফাইনালও বোধহয় এতো উত্তাপ ছড়ায় না।

দৈত্যের হানায় পুরো রাজ্য যখন বিপদে হাবুডুবু, তখনই দেখা দিবেন রাজকুমার। দৈত্যের সাথে লড়বেন তিনি। প্রাণপনে, একাই। কখনো পেছাবেন, কখনো আগাবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোভাবেই দৈত্যের জয় হতে দিবেন না তিনি। চিরচিরায়ত যেকোনো রূপকথার সারাংশ। আজকের ম্যাচেরও কি নয়?

তবে পর্তুগাল এবং রোনালদোর প্রথম দুটি গোল যে ঠিক রোনালদোসুলভ ছিল না। প্রথম গোলটি পেনাল্টিতে, ম্যাচ শুরুর চার মিনিটের মাথায়। যা এই বিশ্বকাপের প্রথম পেনাল্টি, এবং প্রথম পেনাল্টি থেকে গোল। তাতে অবশ্য রোনালদোর খুব বেশি কিছু করারও ছিল না। অসাধারন ফিনিশিংয়ে ডি হায়াকে বোকা বানিয়েই বল জালে জড়িয়েছেন তিনি। এরপরের গোলটি অবশ্য পুরোটাই ডি হায়ার উপহার। স্পেন ততক্ষণে আগের গোলটি শোধ করে ফেলেছে। পুরোটাই ধরে ফেলার মত বলটা হঠাতই হাত থেকে বেরিয়ে গেল স্পেন গোলকিপারের। ফলাফল: খুব ধীর গতিতে বল চলে গেল গোলপোস্টের বা কর্ণারে।

রোনালদোর সেই ফ্রিকিকে ম্যাচটি ড্র হয়ে যাওয়াতে ঢাকা পড়ে গেছে ডিয়াগো কস্টার নৈপুন্যে। তার দুটি গোলেই পরপর দুবার ম্যাচে ফিরেছে স্পেন। বিশেষ করে তার প্রথম গোলটিতে যেভাবে পেপেকে ছিটকে ফেলার পর আরো দুজন ডিফেন্ডারকে বোনা বানিয়ে বল জালে জড়ালেন, সেটা তর্কযোগ্যভাবে আজকের ম্যাচের সেরা গোল হওয়ার যোগ্যতা রাখে। তবে পারপার্স্বিক সব বিষয় মাথায় রেখে এবং ফল নির্ধারণী বলে বেশিরভাগ মানুষ এগিয়ে রাখবেন রোনালদোর শেষ গোলটিকেই।

ম্যাচসেরা হওয়ার যোগ্যতা রাখে নাচো ফার্নান্দেসের শেষ গোলটিও। ম্যাচের ৩২ মিনিট বাকি থাকতে ইসকো এবং সিলভার গড়ে তোলা আক্রমণে পেনাল্টি বক্সের বেশ সামনে বল পান তিনি। সাথে সাথে দুরপাল্লার বাঁকানো শটে বল জড়ান জালে। তার এই গোলেই এগিয়ে যায় স্পেন।

এরপরেই এলোমেলো হয়ে যায় পর্তুগালের খেলা। অনেকক্ষণ বল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি তারা। তবে শেষ পাঁচ মিনিটে মরিয়া হয়ে উঠেন রোনালদোরা। তাতেই ৮৮ মিনিটে ওই সমতা ফেরানো জাদুকরি গোল। সেই গোলের পরেই অতিরিক্ত সময় সহ যে ৭ মিনিট খেলা চলেছে, তখনো স্পেনকে চাপেই রেখেছে পর্তুগাল। আজ খেলায় ড্র হওয়ার জমে গেছে গ্রুপসেরা হওয়ার লড়াই।

আজকে হয়েছে আরো দুটি ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে ৯০ মিনিটে গোল করে মিসরের হৃদয় ভেঙ্গেছে উরুগুয়ে। খেলতে নামেননি মো: সালাহ্। দ্বিতীয় ম্যাচে মরক্কোর আত্মঘাতি গোলে ম্যাচ জিতেছে ইরান।

আজকের ম্যাচে গোল করে টানা চার বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র পর্তগিজ খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। বিশ্বকাপে তার আগে স্পেনের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নি কেউ।

print