এক সপ্তাহে সাত আদেশ : কলমের খোঁচায় দেশ ও বিশ্ব বদলে দিচ্ছেন ট্রাম্প

trump signs tpp

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট তার রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনে একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আইন তৈরিতে অনেক সময় লেগে যায়, কিন্তু হোয়াইট হাউজ কলমের খোঁচাতেই সরকারের নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

দায়িত্ব নেয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেননি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেয়া প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য তিনি একের পর এক নির্দেশ জারি করে যাচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে এসব নির্দেশনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :

১. অভিবাসন ও শরনার্থী প্রবেশে ৭ মুসলিম দেশকে ‘না’

শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসের শপথ অনুষ্ঠানের পরপরই অভিবাসনবিষয়ক বহুল আলোচিত-সমালোচিত নির্বাহী আদেশটিতে সই করেন ট্রাম্প। তাতে সাতটি মুসলিম দেশের অধিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নানা মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই আদেশের কারণে আগামী ১২০ দিন বা ৪ মাস যুক্তরাষ্ট্রে কোনো শরণার্থী প্রবেশের সুযোগ পাবেননা। সিরিয়ার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকালের জন্য, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই দেশের শরণার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারবেন না। সিরিয়াসহ মুসলিমপ্রধান মোট ৭টি দেশের নাগরিক ও অভিবাসীদের আগামী ৯০ দিন কোনো ভিসা দেয়া হবে না। বাকি দেশগুলো হচ্ছে- ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও সুদান।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, এই নিষেধাজ্ঞা সাথে সাথে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। এই সাত দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রগামী বিমানে উঠতে দেয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে অনেককে আটক করা হয়েছে।

২. মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণার দিনই ট্রাম্প বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তার প্রধান লক্ষ্য হবে, মেক্সিকো থেকে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো। আর এর জন্য মেক্সিকোর সঙ্গে সীমান্তজুড়ে তিনি নির্মাণ করবেন শক্ত ও উঁচু দেয়াল। ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দেয়াল নির্মাণের নির্বাহী আদেশে সই করেছেন তিনি।

দেয়াল তোলা টানা ২ হাজার মাইল। নিয়োগ দেয়া হবে অতিরিক্ত ১০ হাজার অভিবাসন কর্মকর্তা। পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলস বা নিউইয়র্কের মতো যেসব শহরে অবৈধ অভিবাসীরা বেশি আশ্রয় নিয়ে থাকেন, সেসব শহরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল তহবিল বরাদ্দ কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

দেয়াল তোলার খরচ তিনি মেক্সিকোর কাছ থেকেই আদায় করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দিয়েছেন, টাকা দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসেনা।

৩. দুটো সিদ্ধান্ত, দুটো পাইপলাইন

ক্ষমতা নেয়ার দ্বিতীয় দিনে ট্রাম্প বহু দুটি বিতর্কিত জ্বালানি পাইপলাইন তৈরির কাজ এগিয়ে নেয়ার আদেশে সই করেছেন। এর একটি হলো কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শোধনাগারে জ্বালানি তেল আনার জন্য ১১৭৯ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগের কারণে ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা এই পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা স্থগিত করেছিলেন।

অন্য পাইপলাইনটির কাজও গত বছর বন্ধ হয়ে যায়, যখন নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের আদিবাসীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এই পাইপলাইন নির্মাণে তাদের জীবন-জীবিকা ও ঐতিহ্য নষ্ট হবে। পরিবেশ বা ঐতিহ্য কোনোটাই আমলে নেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

৪. ওবামাকেয়ার দুর্বল করার নির্দেশ

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতি লম্বা একটি আদেশ জারি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দরিদ্র মানুষের জন্য সহজ শর্তে যে স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করেছিলেন বারাক ওবামা, যা ওবামাকেয়ার নামে পরিচিত, তাতে সরকারি ভর্তুকি দেয়ার ব্যাপারে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এই আদেশে। এজন্য ভর্তুকি ছাড় করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দেরি, সাবধান হওয়া বা বাতিল করার সুযোগ খুঁজতে বলা হয়েছে।

৫. গর্ভপাতে সাহায্য নিষিদ্ধ

সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান ১৯৮৪ সালে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন এই বলে যে, বিশ্বের কোথাও গর্ভপাতে সহায়তা করার কোনো কর্মসূচিতে সাহায্য দেয়া যাবেনা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজে এটি সবসময়ের বিতর্কিত একটি ইস্যু। ডেমোক্রেটরা ক্ষমতায় এলেই তা বাতিল করে। আবার রিপাবলিকান এলে তা আবার সক্রিয় করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঐ নিষেধাজ্ঞা আবার চালু করেছেন।

৬. কেন্দ্রীয় সরকারে নিয়োগ বন্ধ

কেন্দ্রীয় সরকারে নতুন সব নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছেন ট্রাম্প। তবে এর আওতায় পড়বে না সেনাবাহিনী। ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন, সরকারের ঋণ এবং আয়তন কমাতে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বার বার সরকারি আমলাতন্ত্রকে আক্রমণ করেছেন।

৭. ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা টিপিপি চুক্তি থেকে সরে আসা

প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কিছু দেশের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তিকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিল ওবামার সরকার। মার্কিন কংগ্রেস অবশ্য টিপিপি চুক্তিকে এখনো অনুমোদন দেয়নি। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতায় বসেই চুক্তিটিকে ইতিহাসে ছুড়ে দিলেন। (সূত্র : বিবিসি)

scroll to top