পাচারের কারণেই সুইস ব্যাংকে বাড়ছে বাংলাদেশিদের সঞ্চিত অর্থ

নিজস্ব প্রতিবেদক : সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ জমা রাখার পরিমাণ বাড়ছেই। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে এই পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের বেশির ভাগই অবৈধ উপায়ে অর্জিত পাচার করা অর্থ বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদরা। অর্থপাচারের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেয়ায় সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বাড়ছে বলে তাদের অভিমত।

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রতিবছর দেশটির ব্যাংকগুলোর আয় ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কত গ্রাহক কি পরিমাণ অর্থ জমা রাখেন সেই হিসাবও পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় সুইস ব্যাংকগুলোতে ভারতের অর্থ গচ্ছিত রাখার পরিমাণ গেল বছর অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৫ সালে ১শ ২০ কোটি ডলার হলেও ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ৬৬ কোটি ফ্রাঁ (সুইস মুদ্রা)। এমনকি পাকিস্তানিদের অর্থ গচ্ছিত রাখার পরিমাণও কমেছে। ২০১৫ সালে ১শ ৪৭ কোটি ফ্রাঁ হলেও ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ১শ ৩৮ কোটি ফ্রাঁ।

সুইস ব্যাংকগুলোতে বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের জমা করা অর্থের পরিমাণ কমলেও বাংলাদেশের বাড়ছে। বাংলাদেশিদের নামে খোলা অ্যাকাউন্টগুলোতে ২০১৫ সালে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ফ্রাঁ বা পৌঁনে ৫ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬৬ কোটি ফ্রাঁ বা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০০৯ সালের হিসেবে ২০১৬ সালে অর্থ জমার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪.৫ গুণ। ২০০৯ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩শ কোটি টাকা।

সুইস ব্যাংকগুলোতে জমা হওয়া বাংলাদেশির অর্থের বেশির ভাগই পাচার অর্থ বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। নিউজ অ্যান্ড নাম্বারসকে তিনি বলেন, গেল ২-৩ বছর বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। তবে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশ বেড়েছে। কিন্তু সেই হিসেবে শিল্প কারখানা স্থাপন হচ্ছে না। তাই তিনি ধারণা করছেন এই আমদানির আড়ালে পাচার হচ্ছে অর্থ।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনটিগরিটি (জিএফআই) এর প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজ বলেন, সেখানে দেখা যায় আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়েই বাংলাদেশ থেকে বেশির ভাগ অর্থ পাচার হয়ে থাকে। তার কথার সাথে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি ও অবৈধ উপায়ে যারা অর্থ উপার্জন করছে তারা দেশে অর্থ রাখতে নিরাপদ বোধ করেন না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রাজস্ব বোর্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাবি সুইস ব্যাংকে জমা পড়া এসব অর্থের একটি বড় অংশ প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি কিছু প্রতিষ্ঠানের যেগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবসা করছে। তবে এ যুক্তি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। এই ধরনের কথা বলে অর্থপাচারকারীদের আরো উৎসাহী করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করছে তাদের সবার তথ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আছে। চাইলেই এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যারা প্রবাসী তারা কেন শুধু সুইস ব্যাংকেই অর্থ রাখবে। যেসব দেশে প্রবাসীরা আছেন তারা সেখানকার ব্যাংকেই অর্থ রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। আর প্রবাসী যারা স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন না তারা কখনো প্রয়োজনের বেশি অর্থ জমা রাখেন না। পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দেন। তিনিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাজস্ব বোর্ডের যুক্তি মানতে নারাজ। সালেহউদ্দিন বলেন, সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কারণ, এখন বিদেশিরা ধরেই নিচ্ছে সেখানে (বাংলাদেশে) বিনিয়োগের সুযোগ কম, এজন্যই সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার পরিমাণ বাড়ছে।

বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার বেড়ে যাবার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এখনো বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হবার কথা। এছাড়া নিয়ন্ত্রণক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাব, অনিয়ম-দুর্নীতি, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং অর্থপাচারের জড়িত সন্দেহে কোন তদন্ত ও বিচার না হবার কথা। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে সালেহউদ্দিন বলেন, পানামা পেপার্সে নওয়াজ শরীফের নাম আসার পর তাকে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহী করতে হয়েছে। অথচ ঐ পেপারর্সে বাংলাদেশি যাদের নাম আসল তাদের একবার ডেকেও কোন কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি।

এর ফলে যারা নিয়মিত অর্থপাচার করে আসছে তাদের সাহস বেড়ে গেছে। অন্যদিকে নতুন করে যারা অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে তারা অর্থপাচারে উৎসাহী হচ্ছে বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। সুইস ব্যাংক আগের তুলনায় গোপনীয়তা অবলম্বন কিছুটা শিথিল করেছে উল্লেখ করে মির্জ্জা আজিজ বলেন, চাইলে বাংলাদেশ সরকার এই সুযোগ নিতে পারে। সুইস ব্যাংকের কাছে জানতে চাইতে পারে, এই অর্থ সেখানে কিভাবে জমা হয়েছে। অর্থপাচার বন্ধে সমন্বিত, কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলে দেশ পুঁজিশূণ্য হয়ে অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে তারা মনে করেন।

print