নিরীক্ষা ও হিসাবের জায়গাটি বেশ নড়বড়ে

Audit-02.jpg

ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট জাতীয় সংসদে সম্প্রতি উপস্থাপিত হয়েছে এবং বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রযত্নে আইনের মুসাবিদাটি পরীক্ষা-পর্যালোচনাধীন আছে। আইনটির উদ্দেশ্য বিধেয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দেশের জনস্বার্থ সংস্থাসমূহের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কার্যক্রমকে একটি সুনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনয়ন, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার স্ট্যান্ডার্ডস প্রণয়ন, যথাযথ প্রতিপালন, বাস্তবায়ন তদারকি এবং এতদ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যাবলি সম্পাদনের নিমিত্তে একটি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিধান প্রণয়ন কল্পে’ এ বিলটি আনা হয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের আইন আনার দাবি, যৌক্তিকতা, প্রণয়নের প্রচেষ্টা এবং কার্যকর করার কসরত অনেক দিনের, প্রায় এক দশক। সবচেয়ে বড় কথা, এটি এই প্রথম সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। এর ফলে আইন প্রণয়নের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছে এ সুযোগটি সমুপস্থিত হয়েছে যে, আনীত বিলটি প্রকৃতপক্ষে হিসাব ও নিরীক্ষা তথা আর্থিক প্রতিবেদন কার্যক্রমে যথার্থ জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে উপযুক্ত মানদণ্ড নির্ধারণ এবং পরিপালন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে কিনা; তা দেখার। এটা স্বাভাবিক এবং সঙ্গত যে, কোনো আইনকে পূর্ণাঙ্গভাবে পরিপালনীয় করতে হলে এর প্রভাব এবং শনাক্তযোগ্যতা পরিবীক্ষণীয় হওয়া আবশ্যক। এ আইনটি প্রণয়নের যৌক্তিকতা সময় ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মহলের দাবি ও দাতাদের শর্তে উঠে এসেছে, কিন্তু এটি যেভাবে মুসাবিদা করা হয়েছে, তা উদ্দেশ্য পূরণে স্বয়ংক্রিয় হয়েছে কিনা; সেটা যাচাই বাছাই বাস্তবানুগ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ আইনের দাবি বা প্রয়োজনীয়তা থাকার সুবাদে আইন প্রণয়নের শেষ ধাপে পৌঁছা গেলেই আইনটি অর্থবহ হয়েছে ভাবা ঠিক হবে না, প্রবর্তিত আইন প্রয়োগ পর্বে প্রকৃতপক্ষে কার্যকর পাওয়া যাবে কিনা অর্থাত্ আইনটির সারবস্তু তথা স্বয়ম্ভরতা কতখানি, সেটা দেখা অধিকতর জরুরি কর্তব্য।

সুতরাং সংসদে আইনটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণের এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সরাসরি অভিমত জানা হলে আইনটির যথার্থতা, প্রয়োগগত ভবিষ্যত্ কার্যকারিতা-সম্পর্কিত নিশ্চয়তা মিলতে পারে। সংসদে আইনটি উত্থাপনের পর পরই বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোনো একটি বিষয়ে সংজ্ঞা ও এর ব্যাপকতা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। খবরদারি ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এ জাতীয় আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ ক্ষেত্রে বাদ, প্রতিবাদ, পরামর্শ আসাটা স্বাভাবিক এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সেসব বিচার বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আইনটি অধিকতর স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে গঠনমূলক ভিন্নমত বা পরামর্শ প্রদানকে ঢালাওভাবে এ আইন প্রণয়নে বাধা দেয়ার শামিল ভাবা ঠিক নয়। তাই এটা ঠিক, আইন গৃহীত হওয়ার সর্বোচ্চ প্লাটফর্ম হলো সংসদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির আওতায় যথাযথ যাচাই বাছাই তথা সংসদীয় কমিটি কর্তৃক আইনটির চুলচেরা বিশ্লেষণের পর প্রয়োজনে জনমত যাচাইসাপেক্ষে সুপারিশ গ্রহণের যে সনাতন রীতি-পদ্ধতি আছে; সেসব অনুসরণ করেই আইনটি গৃহীত হবে এ আশা করা যায়।

প্রস্তাবিত আইনটি প্রণয়ন ও প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের জনস্বার্থ সংস্থাগুলোয় ফিন্যান্সিয়াল কার্যক্রমে ন্যায়নীতি নির্ভরতার স্বপক্ষে নিরীক্ষা ও হিসাব পেশার নজরদারি ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। নানা কৌণিক দৃষ্টিতে দেখা গেছে, প্রমাণিত হয়েছে, প্রতীয়মান হয়েছে অধিকাংশ আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায়, হিসাব সংরক্ষণে, প্রক্ষেপণে, প্রতিবেদনে, অস্বচ্ছতা রয়েছে, হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পেশাজীবীদের দক্ষতা এবং ন্যায়ানুগতার রীতি-পদ্ধতি প্রয়োগের মননশীল একাগ্রতা ও নিষ্ঠায় অপারগতাজনিত ঘাটতি ধরা পড়েছে। ফলে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগের তীর নিরীক্ষা ও হিসাব পেশাজীবীদের দিকে গেছে। অর্থনীতিতে নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থার জায়গাটা নড়বড়ে হয়েছে এবং দেশের উন্নয়ন ভাবনা দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে।

এ কথা ঠিক, স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে বিগত ৪৪ বছরে অর্থনীতির আকার ও প্রকার বেড়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের বদৌলতে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে লেনদেন ও যোগাযোগের মাত্রাও বেড়েছে বিপুল ব্যঞ্জনায়। বর্ধিত ও স্ফীতকায় এসব কর্মকাণ্ডের যথাযোগ্য হিসাব-নিরীক্ষায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও দেখভালের জন্য উপযুক্ত এবং পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় পেশাজীবীর স্বল্পতা যেমন পরিলক্ষিত হয়েছে, তেমনি তাদের কর্মকাণ্ডের উপরিদর্শন বা নজরদারির আবশ্যকতাও অনুভূত হয়েছে। এসবের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, দৃঢ়চিত্ত মনোভাব ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত কর্মঠ পেশাজীবী এবং উপযুক্ত রীতি-পদ্ধতি প্রক্রিয়া। নিরীক্ষা ও হিসাব পেশার নিয়ন্ত্রণ উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রপতির আদেশ (১৯৭৩ সালের ২ নং আদেশ) বলে প্রতিষ্ঠিত সংবিধিবদ্ধ সংস্থাটির, প্রধান কাজ হিসাব পেশা এবং নিরীক্ষাসহ সব সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের মানোন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করা, নিরীক্ষা ও হিসাব পেশাজীবীদের নিবন্ধন সনদ প্রদান, হিসাব নিরীক্ষা পেশা পরিচালনা অনুমোদনসহ ওই পেশার আচরণবিধির শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে উপযুক্ত শাস্তি বা দণ্ড প্রদান করা। সনদ প্রদান প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ, হিসাব ও নিরীক্ষায় অনুসৃতব্য নির্দেশনাগুলোয় যথা স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ এবং প্রক্ষেপিত প্রতিবেদনে প্রতিবেদনাধীন প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশের নির্মোহ মূল্যায়নের ওপর আস্থার পরিবেশ সৃজনের আবশ্যকতা সে নিরিখেই অনুভূত হয়েছে।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক পরিবেশে এ দেশে নিরীক্ষা ব্যবস্থাপনার বিশ্বব্যাপী বেঁধে দেয়া স্ট্যান্ডার্ড রীতি-পদ্ধতি অনুসরণ হচ্ছে কিনা, তা প্রয়োগে পারঙ্গম কিনা, দক্ষতা ও মানদণ্ড যথাযথ আছে কিনা, সে ব্যাপারে ২০০৪ সালের দিকে বিশ্বব্যাংক আরওএসসি নামে একটি গুচ্ছ সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের বিদ্যমান ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিরীক্ষা ও হিসাবসহ আর্থপ্রশাসনিক বেশকিছু বিদ্যমান আইনকানুনের সুরতহাল পরীক্ষা পর্যালোচনা ও সংস্কারের একটি তাগিদ প্রকল্প গ্রহণ করে। সে প্রকল্পের আওতায় দেশের বেসরকারি খাতে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং পেশা নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান কাঠামো কর্মযোজনা ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সংস্কারের প্রশ্নটি উঠে আসে। চার বছরেরও অধিক সময়ের কসরতের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের শেষ সপ্তাহে উপদেষ্টা পরিষদে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট ২০০৮ নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির (২০০৮ সালের ৬৪ নং) অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা হয়। ২০০৯ সালে সরকার যাচাই বাছাই শেষে অন্য অনেক অধ্যাদেশের মতো এটিও গ্রহণ (র্যাটিফাই) না হওয়ায় পরিত্যক্ত হয়। ফলে আইনটি জন্মিয়াও জন্মলাভ করেনি। পরবর্তীকালে দাতাসংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সাপোর্ট এবং ইসিএফ ঋণগ্রহণের শর্তের মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং পদ্ধতির উন্নয়নের শর্ত পুনরুজ্জীবন লাভ করে। এরই মধ্যে শেয়ারবাজার ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হলে দেশের নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনার দায়-দায়িত্ববোধে দুর্বলতার দিকটি প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। অনেক সময় নিয়ে হলেও মন্ত্রিপরিষদে এফআরএ একবার নীতিগতভাবে, আরেকবার চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এটি উপরিদর্শন সংস্থা সৃষ্টির আইন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন যে কার্যক্রমের উপরিদর্শন উপলক্ষে আইনটি হবে এবং এর আওতায় যে সংস্থা সৃষ্টি হবে, তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে কোনো ভিন্নমত বা অস্পষ্টতা না থাকা বা রাখা আবশ্যক হবে এ আইনটির কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নের স্বার্থে। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের আইন বা কার্যক্রম বাস্তবায়নকালে মালিকানা নিয়ে যে জটিলতা চোখে পড়েছে, তার আলোকেই এ আইনের আওতায় সৃজিত প্রতিষ্ঠান সংগঠন ও তার কার্যক্রম বাস্তবায়ন পর্যায়ে কোন পদ্ধতি প্রায়োগিক, এমনকি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার উদ্ভব হবে; সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে। প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়কে আরওএসসির focal ministry করায় এবং এডিবি এ আইন প্রণয়নের সঙ্গে বাজেট বা সংস্কারসহায়তা প্রাপ্তির শর্ত জুড়ে দেয়ায় আইনটিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বাধীন করা হয়েছে।

দেশের নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর, এর যাবতীয় অপারগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং সবার ওপর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে উপযুক্ত উপরিদর্শন সংস্থা সৃজনের যৌক্তিকতা নিয়ে যদিও কারোরই কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি থাকার কথা নয়, তথাপি এফআরসি গঠিত হলে (১) নিবন্ধনের ব্যাপারে দ্বৈততা সৃষ্টি হবে কিনা, (২) কাউন্সিল কতটা এবং কীভাবে স্বাধীনভাবে যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে উপরিদর্শনের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে, (৩) নিরীক্ষা ও হিসাবায়নের কাজে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাজনিত দেওয়ানি প্রকৃতির অপরাধের প্রতিকার প্রতিবিধানে এফআরসির ক্ষমতাকে অধিকতর শক্তিশালী প্রতিপন্ন করতে যেয়ে ফৌজদারি দণ্ডমুণ্ডের আইন সিআরপিসির আওতায় এফআরসিকে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ারদান পরিস্থিতিকে অতিশয় জটিল ও নিগ্রহমূলক করে তোলে কিনা— এসব বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনের ধারা উপধারা বিশ্লেষণকালে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন ও বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা উঠতে পারে।

এ পর্যায়ে আরওএসসির সুপারিশ পরিপালনে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন বা অভিমত কী, সেটিও বিবেচনার বিষয় হতে পারে। ২০০৪ সালে আরওএসসির সংস্কার সুপারিশে দুটি দিকনির্দেশনা ছিল— (১) বিদ্যমান আইনের বা সংস্থার মধ্যস্থিত দুর্বলতা, অসম্পূর্ণতা, অপারগ পরিস্থিতি ও সংশোধন পরিমার্জন অথবা (২) পৃথক আরেকটি নজরদারি সংস্থা সৃষ্টি করা। দেখা যাচ্ছে, Auditing and Accounting Standard নির্ধারণ এখন আর নিজ নিজ দেশ বা সংস্থার হাতে নেই। আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশসহ সব দেশ। সুতরাং নতুন করে স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণের কাজ বা প্রয়োজনীয়তা তো আর থাকছে না এফআরসি কেন, কোনো সংস্থারই হাতে। এরই মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যস্থিত সংস্কারগুলো অনেকখানি সাধিত হয়েছে বলে আরওএসসির ওপর বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ পর্যায়ে এই আইন প্রণয়ন, এর আওতায় নজরদারি সংস্থা সৃষ্টি ও প্রয়োগ উপযোগিতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

প্রসঙ্গত, দেশের অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেসব গঠনতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়, প্রস্তাবিত এফআরসি তেমন যেন না হয়, সে বিষয়টিও দেখার অবকাশ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এফআরসি সদস্য সংখ্যা মোট ১১। এদের মধ্যে সাতজন পদাধিকার বলে উচ্চপদস্থ পর্যায়ের মনোনীত ব্যক্তি, সংস্থার প্রধান নির্বাহী এবং দুজন বিশেষজ্ঞ। একই যুক্তি ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে মনোনীত তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইডরার প্রতিনিধিত্ব থাকা বা রাখা যৌক্তিক মনে হতে পারে। যাহোক নীতিনির্ধারক কাউন্সিলে অধিকাংশ সদস্য পদাধিকার অথবা প্রতিনিধি পর্যায়ের হলে এবং তারা অস্থায়ী প্রকৃতির হওয়ায় এবং আইনে এফআরসি সভায় কোরাম-সংক্রান্ত কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এফআরসির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এখানে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্টের আইনের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সেখানে একটি শক্তিশালী সংবিধিবদ্ধ আইনের দ্বারা (১৯৮৯ সালের বিওআই আইন) পোশাক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার কথা থাকলেও বোর্ডের সর্বোচ্চ পর্ষদের গঠন, কার্যকরণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণে অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা থাকায় বিনিয়োগ বোর্ড দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এখনো স্বাধীন, নিরপেক্ষ, আধুনিক ও গতিশীল হতে পারেনি।

প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা-উপধারায় বর্ণিত বিধানগুলোর মধ্যে পরস্পর প্রযুক্তকরণের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য ও বিচ্যুতি থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার স্বাধীনতা ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং নিবন্ধন ও নিরীক্ষা পেশা নিয়ন্ত্রণে দ্বৈততার সৃষ্টি হতে পারে এমন সাংঘর্ষিক অথবা অচল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বা দ্ব্যর্থতা সৃষ্টিকারী এমন শব্দ কিংবা বাক্য থাকলে তা খতিয়ে দেখার অবকাশ আছে বলে প্রতীয়মান হয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত যে প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় এনে অর্থাত্ নিরীক্ষা ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় পরিলক্ষিত সীমাবদ্ধতার সংস্কার প্রেসক্রাইব করা হয়েছিল; এরই মধ্যে সেই পরিবেশ পরিস্থিতিতে যদি কোনো কার্যকর উন্নতি বা অবনতি সাধিত হয়ে থাকে, তাহলে একই প্রেসক্রিপশন একইভাবে এখনো রাখা যুক্তিযুক্ত হবে কিনা; সে বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।

দেশের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও অর্থনৈতিক বিষয়ে নিয়ন্ত্রণকারী অপরাপর প্রতিষ্ঠান যথা: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি, ইত্যাদি সংস্থার অন্তর্নিহিত অপারগতা বা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অধিকতর ও যুগোপযোগী গতিশীলতা আনার জন্য বিভিন্ন সংশোধনী এনে তাদের উত্কর্ষতা সাধন ও কার্যকরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। একইভাবে হিসাব ও নিরীক্ষা পেশা নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বাবধান-সংক্রান্ত বিদ্যমান সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর গঠন ও কর্ম কাঠামোয় পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে এসব প্রতিষ্ঠানকে অধিকতর শক্তিশালী করার প্রয়াস অব্যাহত থাকলে হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমের আরো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সাধিত হবে।

Share this post

scroll to top