ট্রিপসের বেঁধে দেয়া সময়সীমা প্রসঙ্গে

Medicine-09.jpg

ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিজিডিএ) তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে ২০০টি অ্যালোপ্যাথিক ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠান ওষুধ উত্পাদন করছে। এখানে প্রায় ২২ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ বিক্রয় হয়, যা দিয়ে ১ হাজার ৫০০ প্রকারের চিকিত্সা হয়। বর্তমানে ওষুধ শিল্প দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ৮৭টি দেশে রফতানি করছে।

বাংলাদেশের এ খাত মূলত ড্রাগ ফর্মুলেশনের শেষ পর্যায়ের কাজে দক্ষ। কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য অ্যাক্টিভ ইনগ্রিডিয়ান্ট উত্পাদন ছাড়াও জেনেরিক ওষুধ রফতানি করছে। বাংলাদেশ প্রধানত এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশে রফতানি করছে। তবে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত মানের গন্তব্যেও রফতানি হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাস্ট মার্কেট রিসার্চের (এফএমআর) তথ্যমতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের মূল্য ২০১৩ সালে ছিল ৩৭৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন টাকা (৩৭ হাজার ৬১১ কোটি টাকা); যা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন টাকায় (৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা)। তাদের হিসাবে স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ।

রিটেইল (খুচরা) বাজারমূল্য: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএমএস হেলথের তথ্যানুযায়ী, অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের বিক্রয় মূল্য ছিল ১১০ বিলিয়ন টাকা (১১ হাজার কোটি টাকা) (১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) (১৪২ কোটি ডলার)। এ হিসাব ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রযোজ্য। ২০১৩-১৪ বছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, এ হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রি ধর্তব্যে আনা হয়নি। আনা হলে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ খাতের বার্ষিক বিক্রি বেড়ে আনুমানিক ১৩২ বিলিয়ন টাকা বা ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারে বেড়ে দাঁড়ায়।

২০১৩ সালে এ খাতে বৈদেশিক এবং স্থানীয় বিনিয়োগ হয়েছে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলার (৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) সমমূল্যের। ওই সময়ে ১২টি নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠান তাদের উত্পাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে।

তবে নকল ওষুধের আধিক্য এ শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নকল ওষুধের প্রচলন এ শিল্পের ঠিক কত টাকার ক্ষতি করছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান যদিও জানা যায়নি, তবে এর বাজারমূল্য বেশ বড় আকারের হবে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং তারা অনুমান করছে তা ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে বেড়ে যথাক্রমে ৬ দশমিক ৪, ৬ দশমিক ৮ এবং ৭ শতাংশে পৌঁছবে। ফলে ওষুধ কেনার জন্য মানুষের হাতে আরো বেশি বরাদ্দ থাকবে। চিন্তিত হওয়ার মতো তথ্য হচ্ছে, ২০১২ সালে অনেক দিন পর প্রথমবারের জনপ্রতি (জিডিপির শতকরা হারে) স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমেছে।

ওষুধ খাতে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান: আইএসএমের তথ্যানুযায়ী, এ খাতের শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাজার দখলে রেখেছে। পরের ১০টি প্রতিষ্ঠান অর্থাত্ একাদশ স্থান থেকে ২০তম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বাজার নিয়েছে। এছাড়া ২১ থেকে ৩১তম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ পণ্য বিক্রয় করেছে। এ খাতের বাকি ১৬৯টি প্রতিষ্ঠান অবশিষ্ট ৫ দশমিক ৯ শতাংশ পণ্য বিক্রয় করেছে।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল এ সময়ে ১৯ দশমিক ২১ শতাংশ বাজার নিয়ে প্রথম স্থান দখলে রাখে। এছাড়া ইনসেপ্টা ও বেক্সিমকো যথাক্রমে ১০ দশমিক ৪২ এবং ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ বাজার নিয়ে এ খাতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করে। উল্লেখ্য, স্কয়ার, বেক্সিমকো, রেনাটা এবং এসিআই ছাড়া শীর্ষ দশে থাকা বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই পাবলিকলি ইনলিস্টেড হয়নি বা শেয়ার মার্কেটে অংশ নিচ্ছে না।

রফতানি: ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত রফতানির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৩৬ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার (৩৬৭ দশমিক ৫ কোটি ডলার) মূল্যের ওষুধ রফতানি হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে ওষুধ রফতানি এখন পর্যন্ত বেড়ে চলেছে।

ট্রিপস এবং ২০১৬ সালে বেঁধে দেয়া সময়সীমা: ট্রিপস TRIPS (Trade Related aspects of Intellectual Property Rights)-এর কারণে ২০১৬ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ সব এলডিসিভুক্ত দেশগুলো পেটেন্ট ছাড়া অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উত্পাদন করতে পারছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশেও রফতানি করতে পারছে।

বাংলাদেশকে অবশ্য ওষুধের কাঁচামাল এপিআই (Active Pharmaceutical Ingredient) এলডিসিভুক্ত নয় এমন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যেখানে পেটেন্টের মূল্য বা রয়্যালটি পরিশোধ করা থাকে। ফলে ওষুধের দাম বেশি পড়ে যায়।

ডব্লিউটিও কর্তৃক ট্রিপসের সময়সীমা ২০২১ পর্যন্ত বর্ধনের অর্থ: ২০১৩ সালের ১১ জুন ডব্লিউটিও ঘোষণা দেয়, ট্রিপসকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়বর্ধন করা হবে, যার সুবিধা এলডিসিভুক্ত দেশগুলো পাবে। ওষুধ খাতেও কি এ সময়বর্ধন প্রযোজ্য হবে কিনা, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন চলে আসে।

যেহেতু সময়বর্ধনের ঘোষণাটি ট্রিপসের পুরো চুক্তি বা সমঝোতাকে নিয়ে, তাই ওষুধ খাতসহ সব পণ্যই যুক্তিসঙ্গতভাবেই এর অধীনে এ সুবিধা পাওয়ার দাবিদার। সমস্যা হচ্ছে, ওষুধ খাত নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আলাদাভাবে এখনো আসেনি।

ট্রিপস ২০২১ সময়বর্ধনের সরকারি উদ্যোগ: ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য ট্রিপসের মেয়াদ বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কেননা এটি বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো এলডিসি রাষ্ট্রের উপকারে আসে না। অন্য কোনো স্বল্পোন্নত দেশে ওষুধ খাতের এত বড় অবকাঠামো নেই।

আরো বলা হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধি করছে, যাতে এলডিসি দেশগুলো সম্মিলিতভাবে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে এলডিসি ফোরামের মাধ্যমে ডব্লিউটিওর ট্রিপস কাউন্সিলে সময় বৃদ্ধির দাবি পেশ করা যাবে।

ট্রিপসের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারলে এলডিসি দেশগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ কিনতে পারবে এবং নিজেদের অবকাঠামো প্রস্তুত করার সময় পাবে। শুধু তাই নয়, যদি এলডিসি রাষ্ট্রগুলো ট্রিপসের সময়বর্ধনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ২০২১ সালের পরও আরো কয়েক ধাপে সময়বর্ধন করা যাবে।

ট্রিপসের মেয়াদ ২০১৬ এর পর বৃদ্ধি না পেলে: যদি ২০১৬তেই ট্রিপস কার্যকর করা হয়, তবে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে রয়্যালটি পরিশোধ করে পেটেন্ট করা ওষুধ প্রস্তুত করতে হবে। ফলে এসব ওষুধের দাম হঠাত্ করে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এক্ষেত্রে নতুন ড্রাগ বা ওষুধের ভোক্তারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, বেশকিছু ড্রাগের পেটেন্টের মেয়াদ ২০১৬ নাগাদ উত্তীর্ণ হবে। যার ফলে সেগুলো প্রস্তুত করতে রয়্যালটি দিতে হবে না।

Share this post

scroll to top