বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মোকাবেলায় করণীয়

FX-08.jpg

বৈশ্বিক মন্দার পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন আমরা বৈশ্বিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। তার চিত্রগুলো আবার সব জায়গায় একই রকম নয়। কিছু উন্নত দেশে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চিত্র ভালো পরিলক্ষিত হলেও অন্য দেশগুলোর অবস্থা দুর্বল। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর তুলনা করলে দেখা যায়, এশিয়ায় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার দ্রুত এবং শক্তিশালীভাবে হচ্ছে, যেখানে চীন ও ভারত নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাছাড়া একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে (উন্নত এবং উন্নয়নশীল) এ পুনরুদ্ধারের গতি দেশভেদে ভিন্ন হচ্ছে।

বৈশ্বিক আর্থিক খাত ও অর্থনীতির মন্দা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, যার প্রধান কারণ ছিল গৃহায়ণ বুদ্বুুদ; যার সঙ্গে যোগ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাব-প্রাইম বন্ধকি বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থা ও আর্থিক খাতের শিথিল নিয়ন্ত্রণ। আর্থিক খাত ও অর্থনীতিতে মন্দা এভাবে শুরু হওয়ার পর তা ছড়িয়ে পড়ে ওইসব শিল্পে, যেগুলো আর্থিক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ২০০৭ সালে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ লক্ষণগুলোর সমাধান করার নীতি গ্রহণ না করে বরং এমন নীতি গ্রহণ করা হয়, যা সমস্যাকে আরো বিস্তৃত ও গভীর করে ২০০৮ সালের শেষ দিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দায় রূপ দেয়। অর্থনৈতিক মন্দা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যদিও সবচেয়ে ক্ষতি করে বৈশ্বিক আর্থিক খাত, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং উন্নত অর্থনীতিকে। অধিক পরিমাণে মন্দায় আক্রান্ত দেশের সরকারগুলো তাদের আর্থিক খাত এবং মূল অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে, যার মধ্যে ছিল বড় বড় শিল্প ও আর্থিক খাতকে জনগণের টাকায় বেইলআউট করা (শিথিলতম শর্তে অর্থ দেয়া)। সবচেয়ে খারাপ বিষয়, ২০১৫ সালে এসেও আমরা এ মন্দা সম্পূর্ণরূপে কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

আমদানি-রফতানির যে ব্যবধান, যাকে চলতি হিসাব ঘাটতি বলা হয়, তা কয়েক দশক ধরে মন্দার অনুঘটকের সূত্রপাত ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রে। ডলার বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হওয়ায় দেশটির সরকার দীর্ঘকাল ধরে শিথিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ঘাটতি পূরণ করা হয় আমদানি-রফতানি বাণিজ্য ধনাত্মক, দেশগুলো দ্বারা (যুক্তরাষ্ট্রকে তারা স্বল্প সুদে ঋণ দেয়)। আশির দশকে অভ্যন্তরীণ মন্দার পর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পল ভলকার যে নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবার সেই নীতি গ্রহণ করেনি। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো নিজস্ব কোনো সমতার নীতিও গ্রহণ করেনি (বাজেট নীতি ক্লিনটনের সময় সমতায় ছিল, কিন্তু সেসময় ব্যক্তি খাতে আয় ও ব্যয়ে সমতা ছিল না। পরবর্তীতে বুশের সময় সরকারি এবং ব্যক্তি উভয় খাতেই কোনো সমতার নীতি গ্রহণ করা হয়নি)।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শিথিল মুদ্রা ও বাজেট নীতির কারণে বাজারে যে সহজ মুদ্রাপ্রবাহ (তারল্য) ঘটে, তা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বিভিন্ন অনির্দিষ্ট দিকে বিনিয়োগ করা হয়। এর ফলাফলস্বরূপ (১) পণ্যদ্রব্য ও সম্পদের বুদ্বুদ সৃষ্টি হয় (যুক্তরাষ্ট্র অর্থনীতিতে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ডটকম বুদ্বুদের বিস্ফোরণের কারণে যে মন্দার সৃষ্টি হয়েছিল, গৃহায়ণ বুদ্বুুদ সৃষ্টি হওয়ায় তা কিছুটা লাঘব হয়); (২) অনিয়ন্ত্রিত শিথিল ব্যবস্থার কারণে ইকুইটি বাইব্যাক (বাজারে বিদ্যমান নিজ শেয়ার কোম্পানি কর্তৃক ক্রয়) শুরু হয় (পুনরায় ইকুইটি ক্রয়ের কারণে কোম্পানির ইকুইটির ওপর মুনাফা বাড়তে থাকে। কিন্তু অপর পক্ষে করপোরেট আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা আরো শোচনীয় অবস্থায় পতিত হয়); (৩) এমন খাতে ঋণ দেয়া হয়, যেখানে ঋণ গ্রহীতার ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য অস্পষ্ট; (৪) জটিল এবং অস্পষ্ট ডেরিভেটিভে বিনিয়োগ করা হয়, যার ভেতরে ঝুঁকির পরিমাণ ইচ্ছাকৃতভাবে অপ্রদর্শিত রয়েছে।

যেহেতু পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাই বিশ্বায়নের কারণে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, তাই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও শিল্প খাতের এ প্রবণতা অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে ওইসব দেশসহ যারা আর্থিক খাত ও বাজেটে সাম্যাবস্থার নীতি গ্রহণ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শিথিল মুদ্রানীতির ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য সেসব দেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়, যাদের মুদ্রার মান যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের ওপর নির্ভর করে। মধ্যপ্রাচ্য তাদের মধ্যে অন্যতম। পণ্যদ্রব্য ও সম্পদের মূল্যের বুদ্বুদের কারণে যে সম্পদের সৃষ্টি হয়, তা বিশ্বের দারিদ্র্য ও পরিবেশের ক্ষতি হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত প্রশমনের জন্য বিনিয়োগ করা হয়নি। বরং যেসব ক্ষেত্রে এ সম্পদের বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে আনন্দ ভ্রমণ, প্রমোদ জাহাজে সমুদ্র ভ্রমণ, প্রাসাদ নির্মাণ এবং এছাড়া অন্য অসংযত ক্ষেত্র, যার মধ্যে আছে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ইচ্ছাপূর্ণ স্বাপ্নিক ও রূপকথার মতো নির্মাণ প্রকল্প, উপসাগরীয় অঞ্চলে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি (যদিও সমুদ্র উপকূলের জলগতিবিদ্যার সঙ্গে এর আচরণ ভিন্ন গ্রহের জীবের মতো), অত্যন্ত দামি শিল্পকলা; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বর্ণের ভেড়া ও কেট মোস স্বর্ণের মূর্তি। এখন এসব ইচ্ছাপূর্ণ স্বাপ্নিক ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের বুদ্বুদ বিস্ফোরণের মাধ্যমে একটি চক্রের শুরু হয়েছে, যা মানুষকে ঋণ পরিশোধ করতে অসমর্থ করে এবং বাজারকে অকার্যকর করে নতুন ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এ নতুন ঋণ পুরনো যেসব ঋণ পরিপক্ব হয়েছিল, তা পরিশোধে সাহায্য করত।

বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি বা বড় অর্থনীতির দেশগুলোর নেতিবাচক নীতি থেকে মুক্ত নয়; যার ফলস্বরূপ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার একটি বড় অংশকে এরা প্রভাবিত করে। তাই জি২০-এর মতো সম্মেলনে স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য এ ছোট দেশগুলোকে একসঙ্গে খুব জোরালোভাবে যুক্তি তুলে ধরতে হবে এবং ওইসব নীতি (শিথিল নীতি, যা অবাধ তারল্য বৃদ্ধি করে বুদ্বুদের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে) বর্জন করতে হবে যা বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বংসের কারণ (যেমন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় শিথিলতা এবং অপর্যাপ্ত নিয়মকানুন ও রক্ষণাবেক্ষণ)।

বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য এবং স্থিতিশীলতার নিরাপদ পথ খুব সহজ হবে— যদি বৈশ্বিক তারল্য বৃদ্ধিটাকে বৈশ্বিক জিডিপির সঙ্গে কোনোভাবে একটা সংযোগ স্থাপন করা যায়, যা বৈশ্বিক জিডিপি বৃদ্ধি বা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে বিপরীত চক্র অনুসরণ করে তারল্যের অনুপ্রবেশ ও প্রত্যাহার নিয়ন্ত্রণ করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (সদস্য রাষ্ট্রের ভোটাধিকার ও তাদের অংশ যুক্তিযুক্তভাবে সংশোধন ও সমতা আনয়নের পর) এ ব্যবস্থার কর্ণধার হিসেবে ক্ষমতা প্রদান করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি সব বৈশ্বিক আর্থিক খাতের চূড়ায় অবস্থান করে নীতি গ্রহণ করবে। নতুন এ ব্যবস্থার জন্য (মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ স্বর্ণের ওপর না হয়ে বৈশ্বিক জিডিপির ওপর হবে) জনমত তৈরি করা খুব সহজ নয়। এ সম্পর্কে জনমত তৈরির জন্য এখনই আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।

বৈশ্বিক আর্থিক খাতের বেশির ভাগ স্থায়িত্ব আনা যায় করপোরেট অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত শিথিলতাকে সংশোধনের মাধ্যমে। বর্তমান সমস্যার একটি কারণ হলো ইকুইটিপ্রধান বিনিয়োগ ব্যবস্থা থেকে ঋণপ্রধান বিনিয়োগ ব্যবস্থায় যাওয়া, যার ফলে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারার জন্য বড় দেশগুলোর আর্থিক খাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সাধারণত ইকুইটি অপেক্ষা ঋণপ্রধান বিনিয়োগকে বেশি পছন্দ করে। কেননা তাতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি কিছু ট্যাক্স মওকুফ সুবিধা পায়। ফলে শিল্প-কারখানাগুলোর আর্থিক খাতের দুর্দশা বৃদ্ধি পায়, এমনকি তা এর ক্ষতিও করতে পারে। যার প্রমাণ আমরা পেলাম বৈশ্বিক আর্থিক খাতে সৃষ্ট মন্দায়।

কয়েক বছর যাবত্ সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে অবস্থিত ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট আর্থিক খাত ও ব্যাংকের জন্য মূলধনের পর্যাপ্ততার আন্তর্জাতিক আদর্শ তৈরি করার কাজে নিয়োজিত আছে। আর্থিক খাতে পরিশুদ্ধ নীতি প্রণয়ন, অতিরিক্ত উদ্দেশ্য সাধনের সীমা নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ও ইকুইটির ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব আদর্শ প্রণয়নের জন্য তাদের নিয়োজিত করা যেতে পারে। অবশেষে সম্পদপ্রধান বিনিয়োগ ব্যবস্থায় ট্যাক্সের পরিমাণ কমানো, ঋণপ্রধান ও সম্পদপ্রধান বিনিয়োগের সুযোগ সুবিধার যে পার্থক্য রয়েছে; তা কমিয়ে আনাই হবে উত্তম পন্থা।

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত জ্যা তিহল উল্লেখ করেছেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় কিছু বিধি নিষেধ প্রয়োজন এবং অন্য এক গবেষণায় আরো অনেক অর্থনীতিবিদের সঙ্গে তিনি ব্যাংকিং খাতের নিয়মকানুনকে সংশোধন করার প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করেছেন। তাই এখনই উত্তম সময়, এ নিবন্ধে যে বিষয়গুলো উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

Share this post

scroll to top