এ ক্ষতি সামাল দেব কীভাবে?

Politics-02.jpg

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে লিঙ্গবৈষম্য কমে এসেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে শীর্ষ দশে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। নবজাতক থেকে বিভিন্ন বয়সের শিশুমৃত্যুর হার কমছে। ২০০৮ সালে পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার ছিল হাজারে ৫৪ জন, যা ২০১৩ সালে নেমে হাজারে ৪১ জনে এসেছে। সেসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মাতৃমৃত্যুর হারও কমেছে। এছাড়া স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, বাসস্থান, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, তথ্যের সহজলভ্যতা, শিক্ষা অধিকারসহ ৫০টি বিষয়ের ভিত্তিতে সামাজিক ও পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি সূচকে ৯৯তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ সূচকে নিকট প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের পেছনে।

মাতৃমৃত্যু কমছে, শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেন, নারীরা সমতার কথা বলছেন। গত ২০ বছরে বাংলাদেশের নারীরা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, অতীতেও হয়েছিলেন। উদ্যোগ বরাবরই নারীরা নিয়েছেন। অর্থ এলে নারীরা সন্তানদের ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন, পরিবারে সহায়তা করতে পারেন। সবচেয়ে আশার দিক, বাংলাদেশের নারীরা রাজনৈতিকভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে নির্বাচিত হয়ে মেয়র পর্যন্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার সর্বক্ষেত্রেই নারীরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নারীরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে ক্ষমতায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষমতায়ন সমতার, উন্নয়নের। একজন নারী চান, সমাজে মূল্যবান মানুষ হিসেবে ক্ষমতায়ন। যিনি নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন, সংসারে অর্থ জোগান দিতে পারবেন, কর দিয়ে সরকারের উন্নয়নে সহায়তা করতে পারবেন; তিনি পুরুষের সঙ্গে সমভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি এবং প্রতিদিনই সফলতার ঘটনা দেখছি। সেটা যেমন আছে টেকনাফে, আছে তেঁতুলিয়ায়ও। আছে হাতিয়া কিংবা সন্দ্বীপেও।

সম্মিলিত উদ্যোগে আমরা যখন মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছি, তখনই দুই মাস ধরে যে সহিংস কার্যকলাপ চলছে, এটা রাজনীতি কিনা প্রশ্ন জাগে। ’৫২, ’৬৯, ’৭১-এ আন্দোলন হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল অন্য দেশ। বর্তমানে এমন কিছু নেই। সবাই বাংলাদেশের। তাহলে কেন নিজের দেশের মানুষকে পেট্রল বোমা দিয়ে মারা হচ্ছে?

রাজনীতি ও সন্ত্রাস এক হতে পারে না। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে সেটা সুস্থ। রাজনীতিতে আন্দোলন থাকবে, দাবি থাকবে, কিন্তু পেট্রল বোমা থাকতে পারে না। মানুষ হত্যা থাকতে পারে না, অর্থনীতি ধ্বংসের চেষ্টা থাকতে পারে না। এখানে পক্ষ কে বিপক্ষ কে? একই দেশের মানুষের মধ্যে এমন সহিংসতা থাকতে পারে, এটা আমি বিশ্বাস করতে চাই না।

এ মুহূর্তে আমার বড় দুশ্চিন্তা, চট্টগ্রামের নারী উদ্যোক্তা নুরুন নাহারকে নিয়ে। যে নুরুন নাহার প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকার গরুর দুধ বিক্রি করতেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০ হাজারে নেমে এসেছে। যিনি স্বপ্ন দেখছিলেন ছোট থেকে বড় হয়ে উঠবেন, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করবেন, তা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নিজের সন্তানের নামে গড়া ‘মুনতাসির ডেইরি ফার্ম’ আজ বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

বরিশালের ‘আঁচল’ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার উদ্যোক্তা বিলকিস আহমেদ লিলি শুধু এগিয়ে চলছেন না, বরিশালের নারীদেরও নিয়ে চলছিলেন উন্নতির দিকে। আঁচলে এখন ক্রেতা নেই, বিক্রি নেই, পণ্য উত্পাদনও নেই। দোকানের ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছেন না। নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে দিশেহারা এখন বিলকিস আহমেদ। বরিশালের নারী উদ্যোক্তাদের যিনি উত্সাহ দিয়ে আসছিলেন, তিনি নিজেই আজ দিশেহারা। তিনি আমাকে জানান, ‘আমাদের কী হবে আপা। আমরা কী আবারো পিছিয়ে পড়ব?’

এটা শুধু নুরুন নাহার বা বিলকিসের সমস্যা নয়, সারা দেশের আনাচে কানাচে প্রতিটি নারী উদ্যোক্তাই আজ এ সমস্যায় ভুগছেন। যে সমস্যার সমাধান তাদের কাছে নেই, আমার হাতেও নেই। প্রতিদিন তারা কীভাবে ব্যবসা করবেন, অর্থের জোগান কীভাবে হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছি। তাদের মুখে ‘আমাদের কী হবে আপা’ প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারছি না। তাদের অনেক পারিবারিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলেও বর্তমান সমস্যার কোনো সমাধান এমনকি উত্তরও দিতে পারছি না। তাদের পথও দেখাতে পারছি না।

বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্য বিশ্বে অনেক স্থানে মডেলে পরিণত হয়েছে। সরকারের পৃথক বাজেট বরাদ্দ, জামানতবিহীন ও স্বল্প সুদে ঋণ এবং সবার প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। দেশের সুনাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মূলধারার অর্থনীতিতেও আমরা রাখছি বড় ভূমিকা।

খোঁজ নিয়ে জানলাম, দুই মাসে বরিশালের ২০০ নারী উদ্যোক্তার ক্ষতি হয়েছে ২ কোটি, চট্টগ্রামের ৩০০ উদ্যোক্তার ৬ কোটি, সিলেটের ৩০০ উদ্যোক্তার ৬ কোটি ও রাজশাহীর ৩০০ উদ্যোক্তার সাড়ে ৪ কোটি টাকা। সারা দেশে আমাদের উদ্যোক্তাদের কত ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা জানি না। শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটা নারীর সমতা থেকে পিছিয়ে পড়া। এ ক্ষতি নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম বাধা। আমরা এ ক্ষতি সামাল দেব কীভাবে?

Share this post

scroll to top