আম আদমির ভারত শাসনের স্বপ্ন

Aam-Aadmi-Party-01.jpg

সম্প্রতি দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে অবিস্মরণীয় বিজয়ের পর জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবেও আবির্ভাবের চিন্তাভাবনা করছেন আম আদমি (এএপি) দলের নেতারা। তবে এবার আর তড়িঘড়ি বা হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়। ধীর পায়ে হাঁটার পরিকল্পনা করছেন এএপিপ্রধান ও দিল্লির নতুন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

প্রসঙ্গত, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়ে মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন এ আম নেতা। এর পর দিল্লিতে স্থানীয় সরকার গঠনের জন্য গত মাসের ৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিস্ময়কর বিজয় পায় আম আদমি পার্টি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি আবারো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আগামী পাঁচ বছর দিল্লির জনগণের সেবায় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিলকে গুরুত্বপূর্ণ অভিহিত করে তা যথাসম্ভব দ্রুত পাস করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন কেজরিওয়াল। একই সঙ্গে দিল্লিতে ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর ঘোষণা দেন তিনি।

সম্প্রতি দলটির মুখপাত্র সংবাদ মাধ্যমকে জানান, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত চারটি রাজ্যে আঞ্চলিক দলের সহযোগিতা ছাড়াই শীর্ষ দল হতে চায় এএপি। যোগেন্দ্র যাদব বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক দল নই। দীর্ঘমেয়াদে আমরা জাতীয় বিকল্পে পরিণত হতে চাই। সে কারণে সচেতনভাবেই প্রথমে দিল্লিকে বেছে নিয়েছি। পরবর্তী তিন-পাঁচ বছরে কয়েকটি রাজ্যে দিল্লি-পাঞ্জাবের চেয়েও শক্তিশালী হতে চাই।’ তবে রাজ্যগুলোর নাম বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তিনি বলেন, এএপি পুরো ভারতের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। এদিকে ইকোনমিক টাইমস বলছে, আসাম, বেঙ্গালুরু, বিহার, গোয়া, গুজরাট, কেরালা, মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যা ও পাঞ্জাবে ভিত্তি গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে এএপির।

দিল্লিতে এএপি সেবাদানে সুনাম করলে এর ঢেউ পড়বে আশপাশে। সরেজমিন ঘুরে পত্রিকাটি বলছে, আসামে কংগ্রেসের একক আধিপত্যের বিকল্প হতে পারে এএপি। ১৪ বছর ধরে আসাম শাসন করে আসছে কংগ্রেস। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে মোদি ম্যাজিকে বিজেপি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও কংগ্রেসের বিকল্প হয়নি তারা। এ সুযোগটাই নিতে পারবে এএপি।

বেঙ্গালুরুতে এএপির প্রাথমিক লক্ষ্য হবে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচন। কিন্তু তার আগে সাংগঠনিক সক্ষমতার দিকে নজর দিতে হবে দলটির। বিহারে গোত্র-রাজনীতি শক্তিশালী হওয়ায় সময় নিতে হবে এএপিকে। গুজরাট থেকে আগামী পাঁচ বছরে বিজেপির আধিপত্য কমানো সম্ভব। এজন্য মিউনিসিপ্যাল, পঞ্চায়েত ও তালুকা নির্বাচনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে এএপিকে। এছাড়া কেরালা, মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যায়ও আগাম প্রস্তুতি নিলে ভিত্তি গড়তে পারবেন কেজরিওয়াল। তবে এএপির পরবর্তী লড়াইয়ের ময়দান পাঞ্জাব।

আম আদমি পার্টির এবারের বিজয়কে প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গত বছর ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর রাজধানী শহরে বিজেপির এ শোচনীয় পরাজয় মোদির জন্য বড় ধাক্কা।

অন্যদিকে দিল্লিতে গত নির্বাচনের মতো এবারো ভরাডুবি হয়েছে কংগ্রেসের। গোটা ভারতে কংগ্রেস নেতাদের দুর্নীতির দুর্নাম মুছে দিল্লির কংগ্রেস নেতার পক্ষে ভোটের বাজারে এসে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। কেজরিওয়ালের ঝাড়ুর ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে সব পরিকল্পনা। ফলে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীকেও ভাবিয়ে তুলেছে এ নতুন দলটি। ভারতের গোটা রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে এবং বড় ধরনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় বসার আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভারতবাসীকে, তার কিছুই এ পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। তার নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সেসঙ্গে ভারতের বেশ কয়েকটি এলাকায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও মোদিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর মধ্যে মোদির নীতি ও কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে এবং বর্তমানের কাজের গতি অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসের ভাগ্য বিজেপিকেও বরণ করতে হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে আম আদমি পার্টির বিপুল বিজয়ে মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। কেননা আগের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়ে দ্বিতীয়বার ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত দিল্লি গড়ার প্রতিশ্রুতি কেজরিওয়াল কতটা রক্ষা করতে পারবেন, সেটা দেখার অপেক্ষায় এখন দিল্লির জনগণ। যদি তার দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ঠিকই রক্ষা করতে পারেন, তবে গোটা ভারতের রাজনীতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সেসঙ্গে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোয়ও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দিল্লিতে দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হলে কেজরিওয়ালের যাত্রা এখানেই থেমে যাবে এবং সেসঙ্গে আম আদমির অস্তিত্বও যে হুমকির মুখে পড়বে, এতে সন্দেহ নেই।

Share this post

scroll to top