অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দেশ?

Politics-03.jpg

এক বছর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। সেদিকে দৃষ্টি দিচ্ছি না। নির্বাচনোত্তর এক বছর পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে অর্থাত্ ২০১৩ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় বহু প্রাণ ঝরে গেছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ভয়াবহ। রাজনৈতিক সংঘাত সত্ত্বেও ২০১৪ অর্থবছরে মোট দেশজ উত্পাদন বা জিডিপি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকের (এডিও) প্রত্যাশা থেকে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও গত এক বছর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির ছিল না। প্রতিটি খাতে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। এ সাফল্যের মূলে রয়েছে সরকারের বিনিয়োগ এবং রফতানি আয়। কিন্তু অর্থবছরের আট মাসের মাথায় অর্থাত্ ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই অর্থনীতির চাকা উল্টো পথে পরিচালিত হচ্ছে। এর মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা। হরতাল, অবরোধ, হানাহানি, রক্তপাত, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সাধন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আর মাত্র সাড়ে চার মাস রয়েছে, রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে জিডিপির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন হবে না। এমনকি জিডিপি ৫ শতাংশ অর্জন হবে কিনা, সেটা নিয়েই শঙ্কিত সবাই। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক। রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, অবরোধে এরই মধ্যে এ খাতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। রফতানি আয় কমে গেছে। বহু গার্মেন্ট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারী তাদের অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শ্রম শিল্পে বিপর্য়য় দেখা দেবে। বহু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভোগ্যপণ্যের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি হয়েছে এরই মধ্যে। যদিও সরকারের তরফ থেকে অর্থনীতিকে সচল রাখতে নানা প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। মূল বিষয় হচ্ছে, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে খাদ্যপণ্যের দাম ৬০ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্য বণ্টনজনিত সমস্যার কারণেই এটা হয়েছে। দেখা গেছে, যেখানে পণ্য উত্পাদন হয়, সেখান থেকে পরিবহনে করে তা আনা সম্ভব হয়নি। পণ্যবাহী পরিবহনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে অথবা ভেঙে চুরমার করা হয়েছে। ফলে শুধু ওই ব্যবসায়ী নয়, পুরো দেশের মানুষ ক্ষতির শিকার হচ্ছে। একদিকে পণ্য উত্পাদনকারী তার উত্পাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না, অন্যদিকে ক্রেতাসাধারণ পণ্য কিনতে পারছে না।

অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তে মূল্যস্ফীতি দাঁড়াতে পারে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছিল, মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের রাজনীতির শেষ কোথায় কেউ বলতে পারে না। তাই অর্থনৈতিক বিপর্যয় কী পরিমাণ হতে পারে তা নিখুঁত করে বলা সম্ভব নয়। এ কথা ঠিক যে, প্রায় দুই মাস ধরে অবরোধ চলা সত্ত্বেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম তেমন বাড়েনি। সরকার খাদ্যশস্যের মজুদ ঠিক রাখতে পেরেছে বিধায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সংকটে পড়েনি। অবরোধ চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে যে ক্ষতি হতে পারে তা হচ্ছে, চাহিদা ও জোগানে সংকট সৃষ্টি হবে।

খাদ্য বিশেষ করে চাল উত্পাদনে বাংলাদেশ আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। চাল রফতানি হচ্ছে। এডিওর মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে এর কুপ্রভাব পড়বে। পণ্য জোগানে সমস্যা সৃষ্টি হবে। একপর্যায়ে শহরে পণ্যের দাম বহুগুণ বাড়বে। অবস্থা এমন দাঁড়াবে— হাতে টাকা থাকা সত্ত্বেও খাদ্যপণ্য কেনা যাবে না। এমন অবস্থা যাতে না হয়, সেজন্য সরকারের উচিত হবে পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা।

শিল্প বিশেষ করে পোশাক খাতে কোনো প্রকার বিপর্যয় হলে রফতানি আয় কমে যাবে। সরকারের সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব পড়বে। এখন পর্যন্ত রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ।

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য কম হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে এ নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হচ্ছে না।

রফতানি আয় বেশি হওয়ায় ২০১৪ সালে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি ৭ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। প্রবৃদ্ধি কমবে ১ শতাংশ। এমনটিই আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা।

Share this post

scroll to top