রাজনীতি ও উন্নয়নে আম জনতার স্বার্থ

Manpower-Export-SA-08.jpg

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের ৪৪ বছর পর দেশের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে মানুষ এখন স্পষ্টতই দুটি শ্রেণীতে ভাগ হয়ে গেছে। সুবিধাভোগী আর সাধারণ মানুষ। সুবিধাভোগীরা বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসীন বা সংযুক্ত থেকে অথবা সর্বগ্রাসী দুর্নীতির সুবিধা পেয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। এরা পক্ষ-বিপক্ষ রাজনৈতিক দলে আছে, সরকারি কাঠামোর সব শ্রেণীর আমলাদের মধ্যে আছে, ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ী ও শ্রমিক-ছাত্রনেতাদের মধ্যে আছে। যারা সাধারণ মানুষ বা আম জনতা; তারা মধ্যবিত্ত, অল্পবিত্ত ও গরিব। তারা কারখানা চালায়, ফসল ফলায়, দোকান করে। তারা গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষ বটে, কিন্তু স্বপ্ন দেখে শোষণহীন সমাজের, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের।

ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশের বর্তমান দুর্নীতি ও দুঃশাসনে পূর্ণ সমাজের পরিবর্তন চায় না, বরং এসব যতই বাড়ে, ততই তাদের আত্মসাত্ আর শোষণের সুযোগও বৃদ্ধি পায়। তারা ব্যাংক লুট এবং জনগণের সম্পদ আত্মসাত্ করে নিজেদের সম্পদ বাড়ায়। এর পর তারা ক্ষমতা দখলের জন্য পাঁচ বছর অন্তর নির্বাচন নাটক করে, যেখানে আম জনতার প্রকৃত রায়কে প্রয়োগ হতে দেয়া হয় না। তারা অর্থ, শক্তি ও প্রভাব খাটিয়ে এবং জাল ভোট দিয়ে জয়কে হাতিয়ে নেয়। তারা তাদের ক্ষমতায় থাকা ও লুটপাটকে অব্যাহত আইন পরিবর্তন করে, এমনকি জনগণের ম্যান্ডেট না নিয়ে সংবিধানও খেয়ালখুশিমতো পরিবর্তন করে। তার পর ক্ষমতার দখল নিয়ে মারামারি করে। বাংলাদেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের মাটি, প্রকৃতি ও জনগণ বহন এবং লালন করে আসছে। এই বাংলার সব জাতির অধিবাসী তথা বাঙালি, চাকমা, সাঁওতাল, গারো, মারমা, কোচ— নানা জাতির মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল— উপনিবেশিক, সামন্তবাদী, ধনতান্ত্রিক সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত জনগণের একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের লক্ষ্য ছিল— জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদির নামে সমাজে সৃষ্ট বিভেদ, বৈষম্য, অনাচার থেকে মুক্ত আধুনিক দেশ গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের ১ শতাংশ লুটপাটকারী রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঋণখেলাপিরা সম্পদ দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই গণতন্ত্রের নামে প্রহসন চলছে। দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে তামাশা চলছে। তারা ভোটের নামে ‘জোর যার তন্ত্র’ কায়েম করেছে। তাই সেসব দেশের আম জনতা জেগে উঠছে। দিল্লির আম জনতা জেগে উঠে এক অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশের মানুষও তাদের মতো জেগে উঠবে। আমরাও বাংলাদেশকে অসুস্থ রাজনীতি আর কায়েমি স্বার্থের রাজনীতিকদের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করব। আমাদের জাগরণে ‘জোর যার তন্ত্র’ নিপাত যাবে, গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। দুর্নীতি ও দুঃশাসন দূর হবে, জনগণ স্বস্তি পাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো তা-ই।

দিল্লির জনগণ অস্ত্র হাতে বিপ্লব করেনি, তারা ভোটের মাধ্যমে বিপ্লব করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদেরও লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সব নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা। কিন্তু নির্বাচনের নাটক সাজিয়ে, জনগণের ম্যান্ডেটের কথা বলে স্বাধীনতার পর এ-যাবত্ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সব দলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, দখল আর শোষণই করে গেছে। এ-যাবত্ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সম্পদ লুটপাট করে সুজলা সুফলা বাংলাদেশকে উজাড় ও ছারখার করে দিয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো নানা রকম কারসাজি করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানকে জনস্বার্থবিমুখ একটি দলিলে পরিণত করেছে। ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রাজাদের দলে পরিণত হয়ে আইন করে নতুন কোনো রাজনীতি বা দলকে নিবন্ধিত করার সুযোগ দিচ্ছে না। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের অগ্রিম স্বাক্ষরের বিধান দিয়ে জোর করে বসিয়ে দিচ্ছে। এভাবে তারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিকৃত করে চরম অগণতান্ত্রিক করেছে। দীর্ঘ ৪৪ বছরের অপশাসনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনসেবামূলক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে জনবিরোধী রূপ নিয়েছে। তাই সচেতন নাগরিকরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ও দায়িত্ববোধের তাড়নায় সব প্রকার অপশাসন, অনাচার ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত হতে চাইছে।

আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে, যিনি ১৯৪৯ সালে আম জনতার স্বার্থে রাজনীতি করার জন্যই মুসলিম লীগ থেকে পৃথকভাবে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে দলটির নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক দল করা হয়। তার সেই দলের লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। দেশের বিপ্লবী ও কমিউনিস্টরা তার সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু সেই দলটি ক্রমে রাজাদের দলে পরিণত হলে তিনি তা ছেড়ে দিয়ে ১৯৫৭ সালে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ গঠন করেন। বিপ্লবী ও কমিউনিস্টরা তার এই নতুন দলে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৭০ সালে বিপ্লবী ও কমিউনিস্টরা অস্ত্র হাতে নিয়ে বিপ্লবের পথে নেমে গেলে তার দল ও রাজনীতি দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু মওলানা ভাসানী আম জনতার রাজনীতি থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।

মওলানা ভাসানী যেভাবে আম জনতার স্বার্থে ‘জননীতি’ চর্চা করতেন, বাংলাদেশের বর্তমান বিপ্লবী ও কমিউনিস্টরা তা করছেন না। তারা একাধারে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা আর বুর্জোয়া দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করছেন, যা পরস্পরবিরোধী ব্যাপার। প্রকারান্তরে রাজাদেরই পক্ষ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সেবা করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ‘রাজা-প্রজা’দের নয়, জনগণের। এ লক্ষ্যে আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’-এর পরিবর্তে ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ করতে চাই। বাংলাদেশকে ১ শতাংশ লুটপাটকারী রাজনীতিক, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঋণখেলাপি শিল্পপতিদের হাত থেকে মুক্ত করে ৯৯ শতাংশ সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র করতে চাই।

বাংলাদেশ যে এখনো ‘রাজা’দের দেশ, তার প্রমাণ ডেপুটি কমিশনারদের ‘জেলা প্রশাসক’ পদবি। বাংলাদেশে জনগণের শাসন তথা সত্যিকারের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য সরকারি দফতর প্রধানদের পদবি পরিবর্তন করতে হবে। ডেপুটি কমিশনার হবেন ‘জেলা জনসেবক (আইন)’, জেলা জজ হবেন ‘জেলা জনসেবক (বিচার)’, পুলিশ সুপার হবেন ‘জেলা জনসেবক (নিরাপত্তা)’, সিভিল সার্জন হবেন ‘জেলা জনসেবক (স্বাস্থ্য)’, নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) হবেন ‘জেলা জনসেবক (পূর্ত)’, জেলা কৃষি কর্মকর্তা হবেন ‘জেলা জনসেবক (কৃষি)’ ইত্যাদি। উপজেলা পর্যায়ের অন্য কর্মকর্তাদের পদবি অনুরূপভাবে পরিবর্তন করতে হবে। জনসেবকদের দুর্নীতির বিচার তথা নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘জন-ন্যায়পাল’ থাকবেন।

বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের উন্নয়ন করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর কেবল ‘জননীতি’ চর্চাই নয়, বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিত্সা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়গুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে লিখতে হবে। একটি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজনীয় আহার ও সুপেয় পানির জোগানের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। প্রতিটি নাগরিক পর্যাপ্ত পরিধেয় বস্ত্র পাবে, প্রতিটি পরিবার একটি পরিচ্ছন্ন আবাসস্থল পাওয়ার অধিকারী হবে— যা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ থাকবে। এছাড়া প্রতিটি নাগরিককে কারিগরি শিক্ষাসহ উপার্জনমূলক পেশায় দক্ষ করতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা ফেলে দিয়ে প্রয়োজনীয় নতুন শিক্ষাক্রম নিতে হবে।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারের জন্য কালো টাকা ব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে জামানতের খরচ ব্যতীত সব ব্যয় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে করতে হবে। আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কোনো রাজনৈতিকব্যক্তিত্ব কোনোক্রমেই কোনো সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বোর্ডে থাকতে পারবেন না। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে কেবল আইন অনুমোদন ব্যতীত কোনো ক্ষমতা রাখবেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সংসদীয় এলাকায় একটি তৃণমূল সংসদ থাকবে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত সব আইন এই তৃণমূল সংসদে আলোচিত হবে। সংসদ সদস্যরা সরকার পতন ব্যতীত স্বাধীনভাবে ভোট দেবেন। তৃণমূল সংসদে রায়ের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ সদস্যরা আইনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেবেন।

আমরা অহরহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের মনে কাজ করে তাহলে দেশটা আম জনতার স্বার্থে পরিচালিত কিনা, সেটাই হবে আমাদের প্রধান বিবেচ্য। এজন্য প্রয়োজন আম জনতার রাজনীতি অর্থাত্ ‘জননীতি’। বাংলাদেশের ডান, বাম সব প্রকার রাজনৈতিক দলকে এখন এদিকে তাকাতে হবে।

Share this post

scroll to top