প্রসঙ্গ: ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া

Business-education-14.jpg

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সামাজিক সূচকের তুলনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, অধিকাংশ সূচকেই বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। যেসব সূচকের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার উল্লিখিত অগ্রগতিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, সামাজিক অগ্রগতি পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে সেগুলোর প্রতিটিরই আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, উল্লিখিত তুলনামূলক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। বিশেষ করে এ আলোচনা যে, কী কী কারণে বাংলাদেশের পক্ষে উত্সাহব্যঞ্জক এ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হলো।

বাংলাদেশের পক্ষে উল্লিখিত সামাজিক সূচকে ভারতের তুলনায় কী কী কারণে এগিয়ে থাকা সম্ভব হলো, তার কিছু বিশ্লেষণ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনেই রয়েছে। তবে সে বিশ্লেষণে ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংককে যেভাবে অতি উচ্চালোকিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে সেটিকে কিছুটা পক্ষপাতমূলক বলেই মনে হয়েছে। বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নে উল্লিখিত দুই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, বিশেষত ব্র্যাকের। তাদের সে ভূমিকাকে খাটো না করেও বলা যায় যে, সামাজিক সূচকে উল্লিখিত অগ্রগতি অর্জনের পেছনে সর্বাধিক কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন আমাদের কৃষকরা। বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের পর্যাপ্ত সরবরাহ কাজে লাগিয়ে এর সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে বর্ধিত ফসল উত্পাদন করে একদিকে তারা যেমন মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্ত করেছেন, অন্যদিকে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শস্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে তারা পুষ্টি পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্য এনে দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর এ দুয়ে মিলে মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিসহ জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এবং এসবের ফলে সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর হারই শুধু বাড়েনি, এ প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষরজ্ঞান বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নানা বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির স্তরেরও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। আর এ উন্নতিরই প্রকারান্তরিক ফল হচ্ছে, মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও নারী শিক্ষায় ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের ৬ শতাংশ এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে কৃষকের মেধা, সৃজনশীলতা ও অবদানের বিষয়টিকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

বিভিন্ন সামাজিক সূচকে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের এ মূল্যায়ন খুবই যথার্থ যে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও সংগঠকদের মধ্যকার একটি বড় অংশ নারী হওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এখানে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন ও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি এবং সে আলোচনা খাতভিত্তিক হলে বিষয়টি অতিসহজেই বোধগম্য হতে পারে।

প্রথমেই আসা যাক কৃষি খাত প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১০ লাখ টন, যা দিয়ে সে সময়ের ৭ কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হতো না। বর্তমানে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি এবং এ ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে খাদ্যশস্য উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ৩৭৭ দশমিক ৮২ লাখ টন। খাদ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে অর্জিত এ অগ্রগতিকে আপাতদৃষ্টে শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় মনে হলেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত, যার মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সূচকের উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত। কৃষক, কৃষি শ্রমিক বা কৃষি খাতের আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের খাদ্যচাহিদা সহজে পূরণ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই সে তার সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তার আগ্রহও বেড়েছে। নারী শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও সে সক্ষমতা ও আগ্রহ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতারই ফল। অন্যদিকে খাদ্যোত্পাদন বৃদ্ধির পেছনে সরকারের কৃষি উপকরণ সরবরাহ ব্যবস্থার বিস্তার এবং উচ্চফলনশীল বীজ উদ্ভাবন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারার পরিপ্রেক্ষিতেই ফসল বা খাদ্যের এ উত্পাদন বেড়েছে।

শিল্প খাতে বিনিয়োগ, উত্পাদন ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে মূলত এ খাতে শিক্ষিত তরুণ মেধাবী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে। আগে এ খাতে শিক্ষিত তরুণরা আসত না বললেই চলে। ফলে সেখানে মেধাহীন, দুর্নীতিবাজ ও ঋণখেলাপি উদ্যোক্তাদের দাপটই ছিল সর্বাধিক, যাদের চিন্তার মূলে কাজ করত নানা নৈতিক-অনৈতিক পন্থায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা লুণ্ঠন এবং একচেটিয়া মুনাফা অর্জন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত উদ্যোক্তারা শিল্প খাতে যুক্ত হওয়ার ফলে এ খাতে উত্পাদন ও উত্পাদনশীলতা দুই-ই উত্সাহব্যঞ্জক হারে বেড়েছে। এতে বেড়েছে এ খাতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির হারও। বিভিন্ন তৈরি পোশাক এবং এ-জাতীয় চিহ্নিত সামগ্রীর বাইরে নতুন নতুন শিল্পসামগ্রী ও অপ্রচলিত পণ্য রফতানি বাড়ার পেছনে এই শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তাদের ভূমিকাই সর্বাধিক। এই শিক্ষিত উদ্যোক্তারা দেশের নতুন ধারার নাগরিক চরিত্র গঠনেও বিশেষ অবদান রাখছেন, যে ধারার ইতিবাচক প্রভাব বিভিন্ন সামাজিক সূচকের ওপরও পড়েছে এবং পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য খাতে পরিস্থিতি এখনো পর্যন্ত যথেষ্টই পশ্চাত্পদ। বিশেষত এ খাতের দুর্বল অবকাঠামোর কারণে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এখনো কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সা সুবিধা ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। কিন্তু তার পরও যে শিশুমৃত্যু ও জন্মহার কমেছে এবং এসবের ফলে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বেড়েছে, সেটি ঘটেছে বস্তুত নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে। বিদ্যালয়গামী মেয়েশিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিবাহিত নারীদের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ, সন্তানকে পোলিও এবং অন্যান্য টিকা খাওয়ানো, নিরাপদ পরিবেশে সন্তান প্রসব, রুটিন স্বাস্থ্য পরিচর্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সচেতনতার স্তর এতটাই বেড়েছে যে, বহু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই সমাজে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্য সংগঠকের দায়িত্ব পালন করছেন। অবশ্য মানতেই হবে যে, নারীর সচেতনতার স্তরকে ওই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারার পেছনে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকাই সর্বাগ্রগণ্য। তবে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শৈথিল্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস কার্যক্রম সাম্প্রতিক সময়ে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, সেটি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে নতুন করে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে কিনা, সে বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট দফতরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তবে যে বিষয়টি আলোচনায় খুব বেশি একটা উঠে আসেনি তা হচ্ছে, বাংলাদেশে সমাজের অপেক্ষাকৃত সুবিধাভোগী অংশ (রাজনীতিক আমলা, ব্যবসায়ী প্রমুখ) যদি আরেকটু কম সুবিধাভোগী, কম স্বার্থপর ও কম মুনাফালোভী হতেন, তাহলে সামাজিক সূচকে এ দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থান এত দিনে আরো অনেকখানি এগিয়ে থাকত। প্রতিপক্ষ ঠেকানো বা প্রতিরোধের জন্য রাজনীতিকরা যদি হরতাল না ডাকতেন, স্তাবক আমলাদের একাংশ যদি রাজনীতিকদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে না খেতেন, মুনাফাখোর অসত্ ব্যবসায়ী যদি দুর্নীতি করে ব্যাংকের টাকা মেরে না দিতেন বা কর-শুল্ক ফাঁকি দিয়ে জনগণকে না ঠকাতেন, তাহলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এত দিনে দুই অঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারত।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে ভারতকে ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাওয়ার এ প্রবণতা অব্যাহত রাখতে হলে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি বাংলাদেশকে এ মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এক. পল্লী অবকাঠামোর উন্নয়ন। অবকাঠামো উন্নয়নের কথা এলেই ইদানীং অনেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ, রাজধানীতে মেট্রোরেল ব্যবস্থা প্রবর্তন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রতিষ্ঠা, পদ্মা সেতু নির্মাণ ইত্যাদি বিষয় সামনে নিয়ে আসেন। বিষয়গুলোর কোনোটিই অপ্রয়োজনীয় নয়, বরং এর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মধ্যে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব তো অপরিসীম। কিন্তু তার পরও বলতে হয়, দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে পল্লী অবকাঠামোর উন্নয়নকে, যার মধ্যে অন্যতম হলো— সব ফসলি জমিতে সেচপাম্প ব্যবহারের সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ। সেটি প্রকারান্তরে দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি ঘাটতি নিরসন, জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

দুই. শিক্ষার সব পর্যায়ে এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার বর্তমান মান দিয়ে আর যাহোক, দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয় কিছুতেই। কারখানায় নিয়োজনের জন্য হোক আর বিদেশে শ্রমিক প্রেরণের জন্যই, কোথাও দক্ষ জনবল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যেনতেন উপায়ে সনদ সংগ্রহকারী যে তরুণ স্নাতকরা বেরিয়ে আসছেন, তারা না পাচ্ছেন চাকরি, না পারছেন আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নিতে। অথচ দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই দক্ষ ও উপযুক্ত লোকবল খুঁজে পাচ্ছে না বলে জানা যাচ্ছে। আর সরকারি চাকরিতে যারা যাচ্ছেন, তাদের অনেকের শিক্ষার মান নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় এই মানের জনবল দিয়ে শিল্প খাতের উত্পাদনশীলতা, রেমিট্যান্সের প্রবাহ কিংবা আমলাতন্ত্রের দক্ষতার স্তর—  কোনোটিকেই কাম্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ ভারত কিংবা বিশ্বের অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়ন সূচকের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মানসংশ্লিষ্ট জায়গাটিতে উন্নতির কোনো বিকল্প নেই।

তিন. রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ তথা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে, এটা আজ প্রায় বৈশ্বিকভাবেই স্বীকৃত। কিন্তু রাষ্ট্রের সেই সামগ্রিক আয়কে জনগণের প্রত্যেকের আয়ে রূপান্তর করতে হলে বণ্টন ব্যবস্থায় যে ধরনের সাম্য ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন, তা করতে হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকেই সর্বাগ্রে জোরদার করতে হবে।

চার. রাষ্ট্র ও জনগণের সব স্তরে আইসিটি-সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রসার, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও চর্চার ব্যাপকায়ন ঘটাতে হবে। এটি করা না গেলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হবে। উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা যেতে পারে। রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কার্যাদেশ সংগ্রহ ও প্রাপ্তি এবং আনুষঙ্গিক লেনদেনের পুরো বিষয়টিই এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে অনলাইননির্ভর। এতে পিছিয়ে থাকায় বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের বহু ছোট রফতানিকারকই উত্পাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। মেলা আয়োজন, প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অনলাইন জ্ঞানের অভাবে অনেক উদ্যোক্তা, কারিগর ও ব্যবসায়ী অংশ নিতে সক্ষম হচ্ছেন না। অতএব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় টিকে থাকতে হলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিককে অনলাইন সক্ষমতার দিকে এগিয়ে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমকে ক্রমান্বয়ে পল্লী অঞ্চলে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ক্রমান্বয়ে এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হতে হবে সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের অপরাপর দেশকে ছাড়িয়ে যাওয়া। তবে সেক্ষেত্রে এশিয়ার দ্রুত অগ্রসরমাণ দেশগুলো বাংলাদেশের একটি প্রাথমিক লক্ষ্য হতেই পারে, কিন্তু একমাত্র লক্ষ্য নয় কিছুতেই। দ্বিতীয়ত. বেসরকারি খাতই অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি  হবে বটে। কিন্তু বেসরকারি খাতের অযৌক্তিক আচরণে রাষ্ট্র ও জনগণ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে, যা বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরেই অনুপস্থিত রয়েছে। ফলে মুনাফার একচেটিয়াত্ব সব প্রকার যুক্তি ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে রীতিমতো কারচুপিতে রূপান্তরিত হয়েছে। (মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মূল্য ও মুনাফার হার বাজারের গতিবিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে সন্দেহ নেই। তাই বলে সেখানে ন্যূনতম যুক্তি ও নৈতিকতার কোনো স্থান থাকবে না— এটা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিম থেকে যারা আমাদের ওপর মুক্তবাজারের ধারণা চাপিয়ে দিয়েছেন, তাদের দেশেও এ যৌক্তিকতা মেনে চলা হয়)। এ অবস্থার অবসানকল্পে রাষ্ট্রের আর্থিক ও অর্থনৈতিক নীতি এবং ব্যবস্থাপনায় মৌলিক গুণগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নইলে দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হওয়ার পরও নানা সামাজিক সূচক এবং জনগণের মধ্যকার আয়বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বৈকি! অতএব অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিকে সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে টেকসই ও স্থায়ী কাঠামোতে রূপদানের প্রচেষ্টাকে অবশ্যই আরো জোরদার করতে হবে।

Share this post

scroll to top