বোরো ফসলের ক্ষতি আমদানি নির্ভরতা বাড়াবে

Paddy-03.jpg

আগের তুলনায় জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমে গেলেও এটি এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং অদূর ভবিষ্যতেও এ অবস্থা বহাল থাকবে। কৃষি খাতের উপখাতগুলোর মধ্যে প্রধান হলো শস্য। শস্য উপখাতের প্রধান ফসল ধান, যা থেকে চাল পাওয়া যায়। ধান বা চালের প্রধান উত্স বোরো ফসল। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দ্রুত আলোচনার দাবিতে সরকার-বিরোধী দল বিএনপি ৫ জানুয়ারি অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছে। অবরোধকে বেগবান করতে ঘন ঘন হরতালও পালন করছে। অবরোধ-হরতালে জ্বালানি তেল, সার, বীজ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বোরো চাষ এরই মধ্যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি দীর্ঘায়িত হলে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে বোরো উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেড়ে যাবে চাল আমদানি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে সরকার গঠন করে। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং সরকার কৃষকবান্ধব ব্যবস্থা নেয়ায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট চাল উত্পাদন অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর উত্পাদিত চালের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টন। ফলে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯২ হাজার টনে (সরকারি খাতে ৫৫ হাজার ও বেসরকারি খাতে ৩৭ হাজার টন)। ২০০৯-১০-এর তুলনায় ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট চাল উত্পাদন ১২ লাখ ৮৪ হাজার টন বাড়লেও ২০১০-১১ অর্থবছরে এর আমদানি আগের বছরের তুলনায় অনেক গুণ বেড়ে যায়। ওই অর্থবছরে চাল আমদানি দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫৪ হাজার টনে (সরকারি খাতে ১২ লাখ ৬৪ হাজার ও বেসরকারি খাতে ২ লাখ ৯০ হাজার টন)। ওই বছর হঠাত্ এভাবে চাল আমদানি বৃদ্ধি একটি রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে উত্পাদিত চালের মোট পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার টন বেশি। ২০১১-১২ অর্থবছরে চাল আমদানির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ১৪ হাজার টনে (সরকারি খাতে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ও বেসরকারি খাতে ৫৯ হাজার টন)। ২০১২-১৩ অর্থবছরে চালের মোট উত্পাদন আগের বছরের তুলনায় সামান্য পরিমাণে অর্থাত্ ৭৫ হাজার টন কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১৪ হাজার টনে। ওই বছর সরকারি-বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় মোট চাল উত্পাদন বাড়ে সাড়ে ৪ লাখ টন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতে আমদানি হয় ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫৬০ টন।

উল্লিখিত বর্ণনা থেকে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে ২০১০-১১ বাদ দিলে অন্য বছরগুলোয় চালের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন আমদানি ছিল যথাক্রমে ৫ লাখ ১৪ হাজার ও ২৭ হাজার টন। এদিকে সরকার চাল উত্পাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের দাবি করলেও এবং চলতি অর্থবছর সরকারি খাতে কোনো চাল আমদানি হচ্ছে না বলে ঘোষণা দিলেও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩ মার্চ সময়কালে বেসরকারি খাতে দেশে চাল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫০ টন, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে কেবল ২০১০-১১ বাদে অন্য যে কোনো অর্থবছরের পুরো সময়ে আমদানিকৃত মোট চালের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে ২০১২-১৩ অর্থবছরে আমদানিকৃত চালের তুলনায় তা ৩০ গুণের বেশি (আমদানি প্রক্রিয়ায় রয়েছে এমন চাল হিসাবে নেয়া হয়নি)। চাল সরকারি নাকি বেসরকারি খাতে আমদানি হচ্ছে তা মুখ্য বিষয় নয়; মুখ্য বিষয় হলো চাল আমদানি হচ্ছে এবং তা দ্রুতগতিতে।

বোরো আমাদের প্রধান চাল উত্পাদনকারী ফসল। আমাদের উত্পাদিত মোট চালের ৫৫ শতাংশের বেশি পাওয়া যায় বোরো থেকে। বোরোর পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আমন, যা থেকে উত্পাদিত চালের কম-বেশি ৩৮ শতাংশ পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট চাল উত্পাদনে বোরোর অংশ ছিল যথাক্রমে ৫৫ দশমিক ৩৮ ও ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ওই দুই বছর আমনের অংশ ছিল যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৭৬ ও ৩৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। অবশিষ্ট ৭ শতাংশ চাল পাওয়া যায় আউশ থেকে। বোরো চাষে বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি বোরোর উত্পাদনশীলতা। কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টিস্নাত কৃষি ফসলের তুলনায় সেচনির্ভর কৃষি ফসলের উত্পাদনশীলতা অনেক বেশি। বোরো মূলত সেচনির্ভর ফসল হওয়ায় এর উত্পাদনশীলতা আমন ও আউশের চেয়ে বেশি। দ্বিতীয়ত. বোরো শুষ্ক মৌসুমে আবাদ হওয়ায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে ফসল নষ্টের শঙ্কা প্রায় নেই বললে চলে। তৃতীয়ত. সূর্যের খরতাপে বেড়ে ওঠায় এবং মূলত সেচনির্ভর হওয়ায় আমনের তুলনায় বোরো ধানে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়ে থাকে। অন্যদিকে আমনের আবাদ খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা সাইক্লোনে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অনেকটা স্বাভাবিক। আমরা দেখেছি, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পর পর দুটি প্রলয়ঙ্করী বন্যা এবং সাইক্লোন সিডর কীভাবে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছিল। ১ কোটি ৩০ লাখ টন উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই মৌসুমে উত্পাদিত আমনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৯৬ লাখ টনে। ফলে ওই অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২০ লাখ ৫৫ হাজার টন, যা ছিল এর আগের সাত বছরের যে কোনো বছরের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী খাদ্যাভাব দেখা দেয়ায় এবং চাল রফতানিকারক কয়েকটি দেশ রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় তত্কালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নগদ অর্থ দিয়েও চাল আমদানিতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল।

চলতি অর্থবছরে আমনের প্রকৃত উত্পাদনের পরিমাণ সম্পর্কিত তথ্য সরকার এখন পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। তবে চলতি আমন মৌসুমের শুরুতে খরা আর মাঝপথের বন্যায় ফসলটির উত্পাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ইউএসডিএ ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের গ্লোবাল এগ্রিকালচারাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (জিএআইএন) প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা বলা হয় (বণিক বার্তা, ২৪ জানুয়ারি)। এর কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ইউএসডিএর দেয়া পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট চাল উত্পাদন প্রাক্কলিত পরিমাণের (৩ কোটি ৪৮ লাখ টন) চেয়ে কিছুটা কম হবে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চাল উত্পাদনে খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় চাষীরা অন্য শস্যের দিকে ঝুঁকছেন। ইউএসডিএ আরো বলেছে, চলতি অর্থবছরে মানুষের খাওয়ার জন্য ৩ কোটি ৫২ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে, যা গত বছরের চেয়ে ৩ লাখ টন বেশি। এর পরিমাণ বাংলাদেশে এ-যাবত্ উত্পাদিত সর্বোচ্চ পরিমাণ চালের (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৪ মোতাবেক ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট ৩ কোটি ৪২ লাখ ৬৫ হাজার টন চাল উত্পাদিত হয়) চেয়ে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন বেশি।

গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে, ৫ জানুয়ারি শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের অবরোধ এবং অবরোধকে বেগবান করতে দেয়া ঘন ঘন হরতালে জ্বালানিসহ কৃষি উপকরণের সংকটে দেশে বোরো আবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে দেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তরাঞ্চলে এ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ডিজেলের অভাবে এ অঞ্চলের শত শত সেচযন্ত্র অচল। অবরোধে সার পরিবহনেও চলছে অচলাবস্থা। বীজ, সার ও কীটনাশকের জন্য হাহাকার চলছে বিভিন্ন এলাকায়। বীজতলা তৈরি হলেও জমি তৈরির অপেক্ষায় রয়েছেন লাখ লাখ চাষী। পত্রপত্রিকায় আরো খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, অবরোধ-হরতালে ভালো বীজ, সার ও জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্নতার কারণে অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ক্রয় করতে গিয়ে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

চলমান অবরোধ-হরতালে চলতি মৌসুমে বোরো আবাদকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সড়কপথে জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ওয়াগন সংকটে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত ওয়াগন না পাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে তেল পৌঁছতে পারছে না রংপুর, শ্রীমঙ্গল ও সিলেট অঞ্চলে। জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহের বিষয়টি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সচিব বৈঠকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব সব সচিবকে চিঠি দিয়ে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে ডিজেল ও সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।

চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকার ও সরকার-বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার কোনো সম্ভাবনা এ মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না। আলোচনা ও সমঝোতা না হলে এবং চলমান অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে বোরো চাষের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল, সার, বীজ সরবরাহসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদান বিঘ্নিত হবে। ফলে চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ যে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়। চাল আমদানিতে যে ঊর্ধ্বভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে তা আরো গতি পাবে। এতে দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি হবে। তাছাড়া চাল উত্পাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে।

উন্নয়ন ভাবনা অতঃপর

রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রমে উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে নানা দিক থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সরকার গঠনের পর তাদের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে যে বিষয়গুলো সামনে রাখার কথা, তাও উন্নয়ন। আমাদের প্রচলিত ভাবনাগুলোয় অর্থায়নের জটিলতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য থেকে শুরু করে উন্নয়নে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ নিয়ে দুর্ভাবনার শেষ নেই। তবে প্রচলিত ধনাত্মক অভিধায় কিছু কথা বারবার এলেও মূল আলোচনা থেকে গেছে বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে। উন্নয়ন ভাবনার ক্ষেত্রে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পরিসরের পাশাপাশি আরো অনেক বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিষয়গুলোকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে আলাদা করে উন্নয়ন নিয়ে চিন্তার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় প্রবৃদ্ধিকে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে আঞ্চলিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে সরকার গৃহীত পরিকল্পনাকে ওই অঞ্চলের মানুষ কতটুকু গ্রহণ করতে চাইছে, সরকারের এ উদ্যোগ মানুষকে কতটুকু সন্তুষ্ট করতে পেরেছে আর মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে কতটুকু সচেতন, তাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে দেখা যায়, ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ব্যাহত হয়। অনেক গ্রামে দেখা যায়, শুধু কারো বাড়ির পেছন দিয়ে অনেক যানবাহন যাতায়াত করবে, শব্দ ও বিশৃঙ্খলা হবে বলে প্রভাব খাটিয়ে কাঁচা রাস্তাকে পাকা করতে দেয়া হয় না। অনেকে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব খাটিয়ে সেতু কিংবা রাস্তা থেকে চাঁদাবাজি করে। সরকারি প্রকল্পে সেখানে পুল কিংবা কালভার্ট হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাবে তা হতে দেয়া হয় না। সেখানে স্থানীয়ভাবে অনিরাপদ বাঁশের সাঁকো তৈরি করে মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হতে বাধ্য করা হয়। এর থেকে প্রভাবশালীরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে চাঁদাবাজি। বাংলাদেশের মতো দেশের উন্নয়ন ভাবনার একটা বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করে এটা।

বাংলাদেশের আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রসঙ্গ বাদ দিলে খোদ রাজধানীর নানা স্থানে এমন অরাজকতা চোখে পড়ে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার নানা স্থান, যেখানে অবৈধভাবে রাস্তাকে মানুষের ব্যবহারের অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরার বিভিন্ন এলাকায়ও চোখে পড়ে এমন নৈরাজ্য। আরেকটু জোর দিয়ে বলতে গেলে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় এ নৈরাজ্য অনেকের দৃষ্টিগোচরে এসেছে। সেখানে মনসুরাবাদ ১২ নং আবাসিক এলাকা এবং দারুস সালামের মধ্যে একটি দূষিত খাল পড়ে। এ খালের ওপর অবৈধভাবে নির্মাণ হয়েছে অনিরাপদ বাঁশের সাঁকো। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াতকে পুঁজি করে সেখানে অন্যায় ব্যবসা করে যাচ্ছে একটি চক্র। তারা মানুষকে অহেতুক হয়রানির পাশাপাশি প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে। একজন মানুষ দিনে যতবার এ সাঁকো পার হোক না কেন, তাকে ২ টাকা দিয়ে যেতে হবে। টাকার অঙ্ক কম হওয়ায় মানুষ তেমন উচ্চবাচ্য করে না। তবে এর থেকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রশ্ন যেমন উঠতে পারে, তেমনি অনিরাপদ এ পথে মানুষের যাতায়াতও নানা দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ।

আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা করেন উচ্চশ্রেণীর মানুষ। এর পর গৃহীত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে সুবিধাভোগী হিসেবেও আসে তাদেরই নাম। ফলে এরাই উন্নয়নের সংজ্ঞা নিজের ইচ্ছামতো বদলে থাকে। ফলে দেখা যায়, সরকারি অনুদানে হাসপাতাল ঠিকই নির্মাণ হয় দরিদ্র মানুষের জন্য, কিন্তু সেখানে সুবিধা ভোগ করে এই ধনীরাই। বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ভিআইপি কার্ড ও স্ট্যাটাস ব্যবহার করে মানুষকে করা হয় বিব্রত। এদিক থেকে ধরলে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া নানা ক্ষেত্রেই ভুল পথে পরিচালিত। পাশাপাশি বারবার বাধাপ্রাপ্ত হয়ে থমকেও গেছে। অন্যদিকে শুধু সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন করার যে চেষ্টা, তাতে ব্যর্থতার হারও আশঙ্কাজনক। বিষয়গুলোয় দৃষ্টি দিয়ে জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্বৃত্তায়ন রোধ ও সমতার ভিত্তিতে এ কাজকে এগিয়ে নিতে হবে। এর বাইরে চেষ্টা করলে আর যা-ই হোক, টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

Share this post

scroll to top