নারী অগ্রগতির বাধা দূর করতে হবে

SME-04.jpg

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দিনটি এক উজ্জ্বল বাতিঘরের মতো। মজুরিবৈষম্য কমানো, কাজের সময়সীমা নির্ধারণের দাবিতে এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের প্রতিবাদে ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের বস্ত্র শিল্পের নারী শ্রমিকদের আন্দোলনের ইতিহাসকে স্মরণ রাখতে ১৯১০ সালে জার্মান শ্রমিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রথম দিবসটি পালনের আহ্বান জানানোর পর থেকে দেশে দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই দিবসটি পালন করা হচ্ছে।

নারীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কুসংস্কার, পশ্চাত্পদ দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী রাজনীতি। এসব মোকাবেলা করেই নারীদের অগ্রসর হতে হচ্ছে, বিজয় ছিনিয়ে আনতে হচ্ছে। পদে পদে বাধা, তার পরও বাংলাদেশের মেয়েরা শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ব্যানবেইজের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেশি। ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীর অনুপাত ছিল ৬৬:৩৪। ২০০৫ সালে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় সমতা আসে। বর্তমানে ছাত্রী সংখ্যা বেশি। উপবৃত্তি, বেতন মওকুফ, বিনামূল্যে বই প্রদান ইত্যাদি কারণে ছাত্রী সংখ্যা বাড়ছে বলে ধারণা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় কম। শিক্ষার সর্বস্তরেই নারী শিক্ষকের সংখ্যা এখনো কম। কোটা ব্যবস্থা করেও এক্ষেত্রে সমতা আনা যায়নি। টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক হিসেবে নারীরা বেশ পিছিয়ে আছেন।

শিক্ষার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও নারীরা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যায় এগিয়ে আসছেন। পারিবারিক ও সামাজিক বিধি-নিষেধ উপেক্ষা করে তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উত্স যেমন— গার্মেন্ট, হিমায়িত চিংড়ি, চামড়া, হস্তশিল্পজাত দ্রব্য, চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে মোট শ্রমিকের বেশির ভাগই নারী। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, মোট রফতানি আয়ের ৭৫ শতাংশ উপার্জনকারী তৈরি পোশাক শিল্প খাতের ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলছেন নারীরা। বিদেশে কর্মরত নারীরা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

নারীদের এই সাফল্যের পেছনে দেশের নারী ও মানবাধিকার কর্মীদের নিরন্তর লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি সরকার ও রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। তার পরও বাংলাদেশের নারীদের এই জয়যাত্রা কণ্টকহীন নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা বৈষম্য-নির্যাতনের শিকার হয়েও নারীরা বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে— এখনো এ দেশের নারীরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অনেক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও প্রবল পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারছেন না তারা। নারীর অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো, নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতন বন্ধ করা। নারী নির্যাতনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির দিক অনেক। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারী আন্দোলনের অনেক বিস্তৃতি এবং নানা পর্যায়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও এ ঘটনা কমছে না। নিরাপত্তার অভাব নারীর স্বাভাবিক চলাচলকে বাধাগ্রস্ত এবং কর্মক্ষেত্র থেকেও পিছু হটতে বাধ্য করে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে সব নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমান বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। জাতীয় জীবনে সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ সংবিধান সমাজ ও জনজীবনে নারী-পুরুষ সমতা ও বৈষম্য রোধের ওপর জোর দিলেও ব্যক্তিগত তথা পারিবারিক জীবনে নারীর অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো কথা বলেনি। ফলে পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন সমস্যা ও বিরোধের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালতে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুসৃত ধর্মীয় বিধান অনুসারে প্রণীত পারিবারিক আইনগুলোর আশ্রয় নেয়া হয়। ফলে একই ধরনের ঘটনা বা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের নারীদের মধ্যে বৈষম্য দেখা দেয়। আবার একই ধর্মের নারী-পুরুষের মধ্যেও বৈষম্য হয়ে থাকে, কেননা এসব ধর্মীয় আইনের অনেক কিছু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও যুগোপযোগী না করায় এতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক অনেক বিষয় রয়ে গেছে। এভাবে সংবিধান জাতীয় জীবনে সমতার গ্যারান্টি দিলেও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে নারী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশে জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও সনদের ধারা ২ এবং ১৬.১.গ-এর ওপর আরোপিত সংরক্ষণ এখনো অব্যাহত আছে, যা সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধারাগুলো সংরক্ষণের ফলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বিশেষ করে বিয়ে এবং বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী প্রবল বৈষম্যের শিকার হন। বলা হয়ে থাকে, সংরক্ষিত ধারাগুলো মুসলিম শরিয়া আইন পরিপন্থী, কিন্তু ঠিক কোথায় এসব দ্বন্দ্ব বা বৈপরীত্য, তা কিন্তু স্পষ্ট করে বলা হয় না।

যুগ যুগ ধরে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার এ দেশের বৃহত্তর নারী সমাজের ভাগ্যোন্নয়ন তথা নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশনের আলোকে প্রণীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নিয়েও কম জল ঘোলা করার চেষ্টা করেনি একটি মহল। ১৯৯৭ সালে প্রণীত নারী নীতিটি সংশোধনের নামে এর মূল চেতনাটিই হারিয়ে যেতে বসেছিল ২০০৪ সালে। নারী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১১ সালে সংশোধিত নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করা হলে নারী স্বার্থবিরোধী এক উগ্রগোষ্ঠী এটিকে কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী বলে অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। ছেলে ও মেয়ের সম্পত্তির সমানাধিকার নিয়ে নারী আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সেই দাবির প্রতিফলন নারী নীতিতে না থাকলেও উগ্রপন্থীরা এ নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছে এবং নারী নীতি বাতিলের দাবি তুলেছে। একপর্যায়ে সরকারও বলেছে, নারী নীতিতে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু তারা রাখবেন না। এভাবে ধর্মের নামে নারীকে অধিকার বঞ্চিত রাখার অপপ্রয়াস বিভিন্ন সময়ে নানা মহল থেকে চালানো হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না হানার অজুহাতে অন্যরা তাতে পরোক্ষ মদদ জুগিয়েছে।

নারী নির্যাতনের মূল কারণ কেবল ব্যক্তি হিসেবে নারীর প্রতি হীন ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই নয়, বরং তাদের প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাবও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে বিদ্যমান নারী-পুরুষ বৈষম্য হ্রাস ও নারী নির্যাতন দূর করার লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন বেসরকারি, মানবাধিকার, নারী অধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের ভূমিকা রাখার অবকাশ আছে। তবে রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ও তার বাস্তবায়নের কাজটি মূলত রাজনৈতিক এবং চূড়ান্ত বিচারে রাজনৈতিক দলই কেবল এ কাজ করতে পারে। নারী নির্যাতন রোধ এবং সমাজে বিরাজমান বৈষম্যমূলক অবস্থার পরিবর্তনে এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কোনো বিকল্প নেই।

Share this post

scroll to top