উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দু:খজনক প্রতিবন্ধকতা

Power-Plant-12.jpg

প্রায় নয় সপ্তাহ হতে চলল দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা চলছেই। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের নামে ২০ দলীয় জোটের লাগাতার হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতা চলছেই। ক্রমাগত সহিংসতায় জনমনে আতঙ্ক যেমন বেড়েছে, তেমনি দেশ প্রায় অচল হওয়ার পথে। চলমান অবরোধে বিরোধীদলীয় জোটের এ সহিংসতা নানা স্থানের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রায় অচল করে দিয়েছে দেশকে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে, যার বেশির ভাগই পেট্রল বোমায় দগ্ধ হয়ে কিংবা ককটেল হামলায় আহত হয়ে। এ দুর্ঘটনাগুলোর সিংহভাগই ঘটেছে বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াতের সময়। অবরোধ-হরতাল আহ্বানকারীদের রোষানল থেকে রক্ষা পায়নি রেললাইন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় বগি উল্টে দুর্ঘটনার পরিমাণও নেহাত মামুলি নয়। বিভিন্ন স্থানে লঞ্চযাত্রীদেরও হামলার শিকার হতে হয়েছে। তবে ভাগ্য সহায় হওয়ায় নদীপথে হামলাকারীরা তেমন সফল হতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকার দিকে আসতে থাকা ট্রাকগুলোও অনেক ক্ষেত্রে হামলার সম্মুখীন হয়েছে। এগুলোয় বহনকৃত কৃষিসামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণও রক্ষা পায়নি আক্রমণ থেকে।

বিএনপি নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে এখনো দাবি করা হচ্ছে তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। এবং তারা কোনো ধরনের হামলা কিংবা জানমালের ক্ষয়ক্ষতির দায় স্বীকার করতে রাজি নন। উপরন্তু তারা অভিযোগ করেছেন তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারি বাহিনী বাধা প্রদান করছে। রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নানামুখী অবিচারের সম্মুখীন। তাদের দাবি, দেশকে বিশৃঙ্খল রাখতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাই দেশজুড়ে এ ধরনের সহিংসতার বীজ ছড়াচ্ছে।

হরতাল ও সহিংসতা প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক সব ধরনের গণমাধ্যমে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। তারা সংঘাতের এ চিত্র বিভিন্ন ধরনের পরিসংখ্যানগত উপাত্ত ও লেখচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছে। এখানে দেখা গেছে, ১ হাজার ২০০টির মতো যানবাহন পুড়েছে, অনেকে বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন এখনো। হাজারের বেশি মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন কমবেশি, যাদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হওয়া হরতালের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জানা গেছে। এক্ষেত্রে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানলে আঁতকে উঠতে হয়; যার পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা । এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্প, পরিবহন খাত, কৃষি, পর্যটন, হাউজিং ও নির্মাণ থেকে শুরু করে ছোট দোকানপাট, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, সিরামিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে পরিস্থিতির দায় মেনে নিয়ে সরকার বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চলাচল নিরাপদ করতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এতে নাশকতা কিছুটা কমলেও লাগাতার আক্রমণে অনেক ক্ষেত্রেই শেষ রক্ষা হয়নি। রাতের বেলা মহাসড়কে চলমান গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। রাত ৩টার দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি বাসে সংঘটিত হামলার কথা এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে। ওতে পেট্রল বোমার হামলায় ঘটনাস্থলেই সাত যাত্রী দগ্ধ হয়ে মারা যান, যেখানে দুটি পরিবার শীতের ছুটি কাটিয়ে কক্সবাজার থেকে ফিরছিল বলে জানা গেছে। সেখানে গুরুতর দগ্ধ প্রাণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অনেকেই এখনো বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

আক্রান্তরা পুলিশ ও মিডিয়ার সামনে আক্রান্ত হওয়ার যে বিবরণ দিয়েছেন, সেখান থেকে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করা যায়। বিশেষ করে রাতের আঁধারের সুযোগ নিচ্ছে আক্রমণকারীরা। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে সুযোগ বুঝে হামলা চালিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেটে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন যুবক আক্রমণে অংশ নেয়, যাদের কাজ বিভিন্ন চলন্ত গাড়িতে পেট্রল বোমা নিক্ষেপ করে পুলিশের নজর এড়িয়ে সটকে পড়া। তাদের অনেককে বিভিন্ন স্থানে পথচারীরা শনাক্ত করতে পেরেছে, পাশাপাশি ক্যামেরার ফুটেজ থেকেও তাদের অনেককে শনাক্ত করা গেছে এবং পরে গ্রেফতারও হয়েছে তাদের অনেকে। পুলিশি হেফাজতে নেয়ার পর তারা লোমহর্ষক এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণও স্বীকার করেছে। এখানে দেখা গেছে, আক্রমণকারীদের বেশির ভাগই যুবক, যারা কর্মহীন। এরা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে এসব হামলায় অংশ নিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ বেশ কয়েকজন হামলাকারীকে পুুলিশ আটক করেছে, যাদের ছবি ও নাশকতার উপকরণগুলোর চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশও হয়েছে। এ ধরনের কিছু ঘটনা অনেক সময় ঘটেছে চট্টগ্রামের হাটহাজারি ও ঢাকায়। অনেক সময় একেবারে পুলিশের নাকের ডগায়, যা ভাবতেই অবাক লাগে।

বিভিন্ন আলামত যাচাই করে সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, এগুলোর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা জড়িত। কিন্তু একটি সভ্য দেশে এ বর্বর আচরণ আর কত? এ ধরনের ঘটনা আমাদের আসলে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আজ থেকে বছর পঞ্চাশেক আগে বিচারপতি কায়য়ানির একটি উক্তি আজ আমার খুব মনে পড়ছে, যা তিনি করেছিলেন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছিলেন, অনেক সময় গণতন্ত্রের অপভ্রংশ হয় এমন যে, ‘লোক কিনে নাও, মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হও এবং মানুষকে জব্দ করো (Buy the people, far the people and off the people)।’ আর আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক দলে নিজেদের মধ্যেই এখন আব্রাহাম লিংকন সংজ্ঞায়িত সেই গণতান্ত্রিক অনুশীলন নেই। ক্ষমতার দৌড়ের ক্ষেত্রে তারা যখন ময়দানে নামে, একমাত্র পথ হয়ে যায় সহিংসতা এবং সংঘাত। তাদের মনে রাখা উচিত, হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি বাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেও গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিচালনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অহেতুক লক্ষাধিক মানুষের আর্থিক ক্ষতি, আক্রমণ ও নিরীহ জনগণের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে কখনই সমর্থন করা যেতে পারে না।

একটা বিষয় পরিষ্কার, লাগাতার হরতাল উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতিতে একটি ধস নামিয়েছে, যা কখনই কাঙ্ক্ষিত ছিল না। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা থেকে জানা গেছে, প্রবৃদ্ধির যে ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ মান ধরা হয়েছিল, তা থেকেও যোজন যোজন দূরে থেমে যেতে হবে এ হরতাল-অবরোধের কারণে। স্মরণ করা জরুরি, সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ এ প্রবৃদ্ধি নেমে গিয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ হওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। এক্ষেত্রে এডিবির নির্ধারিত মান ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী তা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ার কথা। এ ধরনের হরতাল-ধর্মঘট থেকে শুরু করে অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে এর কারণে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত তো হচ্ছেই, পাশাপাশি সহস্রাব্দ উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাও মাঝ পথে থমকে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এটা না হয়ে যদি পরিস্থিতি ২০১৩-২০১৪ সালের মতো নির্বিঘ্ন থাকত, তবে ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের পক্ষে খুব সহজেই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হতো। তবে আন্দোলনের নামে এখন দেশে যা চলছে, তা মেনে নেয়া যায় না। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে যে সহিংসতা এখন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, সেটাকে কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। অন্তত দেশের উন্নয়নের স্বার্থ বিচার করতে গেলে এ ধরনের অন্যায় আচরণ নজিরবিহীন ও দুঃখজনক।

এদিকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক আয়-সম্পর্কিত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি থেকে শুরু করে তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ড তৈরি পোশাক শিল্পকে নানা দিক থেকে বিপর্যস্ত করেছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় এ শিল্পের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন দূরে থাক, ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করাও অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এ ব্যাপারে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে। বিশ্বের নামিদামি অনেক ব্র্যান্ড চলমান অস্থিরতায় বিব্রত হয়ে তাদের চুক্তি বাতিল কিংবা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে। বিশেষ করে যাতায়াত ও পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। আরেকটি দুর্ভাবনা হয়ে দেখা দিয়েছে ক্রমবর্ধমান সিরামিক শিল্পের দুর্গতি। এক্ষেত্রে ৫৪টির মতো কোম্পানি প্রায় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে এ খাতে। তাদের অনেকে আবার নতুন করে ব্যবসার কলেবর বৃদ্ধির কথা ভাবছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের ব্যবসায় বাধ সেধেছে। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে কাঁচামাল নিয়ে আসা এবং উৎপাদিত পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঝামেলা এ ব্যবসাকে মাঝ পথে থামিয়ে দিচ্ছে।

লাগাতার হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতা দেশের উন্নয়নকে যেমন খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, তেমনি স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে নানা দুর্ভাবনার আবর্তে। শিক্ষা থেকে শুরু করে আরো নানা ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা। বিশেষ করে এসএসসি ও ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার মধ্যে হরতাল-অবরোধ শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ এবং অভিভাবকদের দুর্ভাবনাকে শেষ সীমায় নিয়ে গেছে। সময়সূচি পরিবর্তন থেকে শুরু করে নানাবিধ অনিশ্চয়তায় ত্যক্ত বিরক্ত সবাই। অন্যদিকে সময়মতো পরীক্ষা না হওয়ায় পরীক্ষার্থীদের মনঃসংযোগে চিড় ধরেছে, যা তাদের শিক্ষার উপযুক্ত বিকাশে অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যে সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে, তা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বাদে আর কোনো পথ বের করবে না। উপরন্তু ক্রমবর্ধমান সংঘাত রাজনৈতিক সংকটকেই আরো বাড়িয়ে তুলবে নিঃসন্দেহে। হরতাল ও অবরোধের মতো ঘৃণ্য কর্মসূচি কখনই দেশের জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে না। এ ধারণা পোষণ করে দেশ ও মানুষের স্বার্থে এ পথ থেকে সরে আসতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করার বিকল্প নেই, যা কখনই সংঘাতের পথ ধরে আসতে পারে না। এক্ষেত্রে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করতে পারে। এর মাধ্যমে সংঘাতের পথ পরিহার করে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

Share this post

scroll to top