ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসায় ধস

CTG-Port-05.jpg

হরতাল-অবরোধের কারণে দেশের অন্যান্য ব্যবসার ক্ষতি নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও পণ্য আমদানি-রফতানিতে লজিস্টিক সেবা প্রদানকারী ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে তেমনটি হয়নি। অথচ দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ এ লজিস্টিক কোম্পানির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এ সেবা প্রদানে উদীয়মান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্থান এখন চতুর্থ। আর লজিস্টিকস সূচকের ৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম। গত তিন দশকের লজিস্টিক খাতে উন্নয়নের মূল্যায়ন করলে যে কারো কাছে বাংলাদেশে অগ্রগতির উপরোক্ত চিত্র বাস্তবসম্মত মনে হবে। চলমান হরতাল-অবরোধে পণ্য পরিবহনে সংকটের কারণে এখন এ গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতটি বড় ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ১৯৭২ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সবজি এবং বিদেশী দূতাবাসের কর্মকর্তাদের ব্যাগেজ পরিবহনের প্রয়োজনে গুটি কয়েক কোম্পানি নিয়ে দেশে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতের যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ১৯৮০ সাল থেকে পোশাক রফতানিকারকদের রফতানি ও আমদানি সেবা প্রদানের প্রয়োজনে এর দ্রুত বিকাশ ঘটে। বর্তমানে এ শিল্পে সনদধারী কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৯০০, সনদ প্রক্রিয়াধীন কোম্পানি মিলিয়ে মোট সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আমদানি-রফতানিকৃত পণ্যের মূল্যমান ছিল প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার। সমুদ্রপথে ১৭ লাখ কনটেইনার আর বিমানপথে প্রায় ২ লাখ ৫৪ হাজার টন পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে উপরোক্ত পণ্যসামগ্রীর আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানেও হচ্ছে। সেবার বাজারের আকার, প্রবৃদ্ধি ও লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর সেবাদানের দক্ষতা বা সক্ষমতা উপরোক্ত বাস্তবতার প্রতিফলন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯৫ শতাংশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, আমাদের দেশে অনেকে এ ব্যবসা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা রাখেন, এমনটি বলা যাবে না। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং এজেন্টরা পরিবহন কারিগর হিসেবে সর্বাধিক কম খরচে, যথোপযুক্ত মাধ্যমে, যথাসময়ে আমদানি-রফতানিকারকদের পণ্য পরিবহন করে থাকে। অতীতে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের কার্যাবলি এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানিগুলোর এজেন্ট হিসেবে কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের কার্যাবলি উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত বিস্তৃত। সে কারণে এ সেবা এখন সাপ্লাই চেইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং যে কোনো দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে পণ্য সংগ্রহ ও পরিবহন, গুদামজাতকরণ, মোড়কীকরণ, সঠিক পরিবহন নির্বাচন, জাহাজীকরণ (বিমান, সমুদ্র বা স্থলপথে অথবা একাধিকের সমন্বয়ে), ছোট ছোট পণ্যের চালান একত্রে বুকিং করে স্বল্প ভাড়ায় পণ্য প্রেরণের ব্যবস্থা করে। যথাসময়ে পণ্য না পৌঁছালে আমদানিকারকরা পণ্য গ্রহণ করেন না। এতে রফতানিকারকরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা পণ্য গন্তব্যে পৌঁছা পর্যন্ত সব পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করে বুকিং অনুযায়ী পরিবহন নিশ্চিত করেন এবং পণ্যের অবস্থান, আগমনের সময় ও তারিখ আমদানিকারকদের অবহিত রাখেন। স্পেস স্বল্পতার কারণে রফতানিকারকরা যখন মালপত্র সময়মতো পরিবহনের অনিশ্চয়তায় পড়েন, তখন ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা নতুন নতুন রুট সন্ধান করেন বা বিশেষ কার্গো বিমানের মাধ্যমে মালপত্র পরিবহন করে রফতানিকারকদের লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করেন। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রেও এ ‘পরিবহন কারিগর’রা একই ধরনের কাজ করেন। বন্দরে বা এয়ারপোর্টে পণ্য আসার পর কাস্টমসে মেনিফেস্ট দাখিল করেন, পণ্যের সঠিক গুদামজাতকরণ নিশ্চিত করেন।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা আমদানি-রফতানিকারকদের বিভিন্ন দেশের আমদানি-রফতানি নীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়ে বাণিজ্য প্রসারে সহায়তা করেন। আমাদের দেশ থেকে রফতানি পণ্যেও প্রায় শতভাগই ঋণপত্রের শর্তানুযায়ী রফতানি হয়ে থাকে। ব্যাংকের অনাপত্তিপত্রের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি না হলে রফতানিকারকরা তাদের পণ্যের মূল্য পান না। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা তাদের বিদেশী এজেন্ট বা সহযোগীদের মাধ্যমে ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র প্রাপ্তির মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করেন।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা কমিশনের মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, তাতে আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার সমৃদ্ধ হয় তথা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়। শুধু তাই নয়, এ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডাররা ভ্যাট প্রদানের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ান। দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে এ খাতে এখন প্রায় ১০ লাখ নারী-পুরুষ কর্মরত। ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ পেশায় কর্মরতদের সংখ্যাও বাড়ছে।

উপরোক্ত বাস্তবতার নিরিখে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য তথা অর্থনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও আমাদের দেশে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। যে আমদানি বা রফতানিকারকরা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ছাড়া তাদের ব্যবসা করতে পারেন না, তারাই যেন এদের অস্তিত্ব মেনে নিতে চান না। সেবার মূল্য দিতে চান না। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কাজ সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষও প্রায় একই আচরণ করে। একই আমদানিকারক যিনি তার আমদানি পণ্য সঠিকভাবে বা সময়ে না আসার জন্য কিংবা একই রফতানিকারক যিনি তার রফতানিকৃত পণ্য সঠিক সময়ে না পৌঁছার জন্য অথবা বায়ারের ব্যাংকের অনাপত্তি না নিয়ে পণ্য ডেলিভারির কারণে পণ্যের মূল্য না পাওয়ার জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের দায়ী করেন, সেই আমদানি বা রফতানিকারক এদের মেনে নিতে চান না। সেবার মূল্য দিতে চান না। অথচ সব সেবা প্রদানকারী তার সেবার মূল্য নির্ধারণ করার আইনগত অধিকার রাখেন। সেবা নেয়া বা না নেয়া সেবা গ্রহণকারীর এখতিয়ার, সেবার মূল্য নির্ধারণ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক আইনে তাদের এ এখতিয়ার নেই। তার পরও তারা তা করার চেষ্টা করেছেন, সরকারি পর্যায়ে ইনকোটার্মসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে পণ্যের ডেলিভারি অর্ডার ফিসহ অন্যান্য সেবার যৌক্তিক মূল্য নেয়া থেকে বিরত রাখার প্রয়াস চালাচ্ছেন। যেমন তারা বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে, প্রিপেইড আমদানির ক্ষেত্রে ফরওয়ার্ডাররা কোনো সার্ভিস ফি নিতে পারবেন না, তা নাকি আইসিসি ইনকোটার্মসের পরিপন্থী। অথচ তারা যদি বায়ারের কাছে জানতে চান যে, তারা এ দেশ থেকে যে পণ্য প্রিপেইড হিসেবে পাঠান, সে পণ্যের ডেলিভারি নেয়ার জন্য সে দেশের ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কোনো ফি দেন কিনা? তবে তারা বুঝতে পারবেন যে, তাদের অবস্থান সঠিক নয়।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগনির্ভর হওয়ার কারণে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি শিক্ষিত জনশক্তিনির্ভর ব্যবসা। কাস্টমস থেকে সনদপ্রাপ্তি, বন্দরগুলোয় সংযুক্তি, অফিস, গুদাম ও পরিবহনে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ, এয়ারলাইনসগুলোয় ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান এবং আইটি খাতে বিশাল খরচের আবশ্যকতার কারণে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি অন্যতম ব্যয়বহুল ব্যবসা। হরতাল-অবরোধের কারণে ব্যবসা কমে যাওয়া ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা এবং সেবাগ্রহীতাদের অসহযোগিতা ও সেবার সঠিক মূল্য প্রদানে অনীহার কারণে এখন অনেক দেশী ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি অস্তিত্ব হারানোর পথে। তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এ লজিস্টিক খাত টিকিয়ে রাখার জন্য স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, প্রণোদনা দান এবং স্টেকহোল্ডারদের আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী সেবামূল্য প্রদান করা অতীব জরুরি। সবাইকে এ সত্য মনে রাখতে হবে যে, লজিস্টিক সেবার সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া রফতানি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

Share this post

scroll to top