ওয়াকা ও ক্রিকেট নস্টালজিয়া

রাহিন ফাইয়াজ : জাভেদ মিঁয়াদাদ এবং ডেনিস লিলি কি নস্টালজিক হচ্ছেন না? ওয়াকায় শেষ টেস্ট খেলা হয়ে গেছে। তাদের কি মনে পড়ছে না সেই বিখ্যাত মারামারির কথা? মাঠে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বাগবিতন্ডা অনেক দেখেছে ক্রিকেট। তবে খুব সম্ভবত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুজন খেলোয়াড়ের মধ্যে মারামারির একমাত্র সাক্ষী ওয়াকাই।

১৯৮১ সালের কথা। পাকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথম টেস্টে রান নেয়ার সময় বোলার লিলির সাথে ধাক্কা খান মিঁয়াদাদ। লিলি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। ঘুরেই লাথি মেরে বসেন মিঁয়াদাদকে। মিঁয়াদাদও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। হাতের ব্যাটটি উঠিয়ে তেড়ে যান লিলির দিকে। শেষ পর্যন্ত আম্পায়ার এসে আলাদা করেন দুজনকে।

ডেনিস লিলির অবশ্য নস্টালজিক হওয়ার আরো কারণ আছে। ‘হোম অফ ক্রিকেট’ ওয়াকার সাথে জুড়ে আছে তাঁর নাম। ক্যারিয়ারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এই মাঠে খেলেছেন তিনি। ওয়াকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিশেষত্ব হলো বিখ্যাত বাউন্সি এবং দ্রুতগতির পিচ- পেসারদের স্বর্গ। এই মাঠে লিলির বডিলাইন বাউন্সার খেলতে রীতিমত ভয়ে কাঁপতেন ব্যাটসম্যানরা। তবে এই পিচ ওয়াকা হারিয়েছে অনেক আগেই। এখন আর ওয়াকার পিচে বল আগের মতো বাউন্স খায় না, বল পড়েও আগের মতো দ্রুতগতিতে যায় না। এখনো অনেক ক্রিকেটভক্ত ডেনিস লিলির ওয়াকার স্মৃতিচারণ করেন।

খেলা ছাড়াও কোকড়াচুলো এই রগচটা অজি ফাস্টবোলার ওয়াকায় অনেক কান্ড ঘটিয়েছেন। এর অনেকগুলোই ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে স্থান পেয়েছে। মিঁয়াদাদের সাথে ওই মারামারি তো আছেই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৭৯ সালে ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম এবং শেষবারের মতো অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাট নিয়ে খেলতে নামেন তিনি। চার বল পরেই অবশ্য সেই ব্যাট বদলাতে হয় তাকে।  ইংলিশ অধিনায়ক মাইক ব্রেয়ারলি আম্পায়ারদের কাছে বিচার দেন, ব্যাটটি বলের ক্ষতি করছে। বলের আকৃতি নষ্ট হয়ে গেছে। আম্পায়ারা খেলা থামিয়ে লিলির সাথে কথা বলতে যান। তখন কী ধরণের ব্যাট দিয়ে খেলতে হবে ব্যাটসম্যানদের, সে বিষয়ে আইসিসির সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম ছিল না। তাই লিলিকে বোঝাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল আম্পায়ারদের। প্রায় ১০ মিনিট পর তীব্র আক্রোশে ব্যাটটি ছুড়ে ফেলতে দেখা যায় তাকে।

নস্টালজিক হতে পারেন রিকি পন্টিংও। তার শুরু এবং শেষ- দুটোই যে ওয়াকায়। হয়তো নস্টালজিক হচ্ছেন ডেভিড ওয়ার্নারও। ওয়ার্নার কেমন খেলোয়াড়, সেটা বিশ্ব প্রথম দেখেছিল ওয়াকাতে। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম এবং একইসাথে দ্রুততম সেঞ্চুরিটি তিনি পেয়েছিলেন এখানেই। গ্লেন ম্যাকগ্রা পেয়েছিলেন তার ৩০০তম উইকেট। ওয়াকা এরকম আরো কতো কিছুর যে সাক্ষী, তা লিখে শেষ করা যাবে না।

ওয়াকায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু হয়েছিল এক অ্যাশেজ দিয়ে, ১৯৭০ সালে। গ্রেগ চ্যাপেল সে ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন। সে সময় ওভার ছিল আট বলের। ওয়াকায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শেষটাও আরেক অ্যাশেজের মধ্যে দিয়েই হলো। বৃহস্পতিবার অ্যাশেজের তৃতীয় ম্যাচ দিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলো ওয়াকা।

অস্ট্রেলিয়ার পার্থে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন স্টেডিয়াম। পার্থের নামেই নাম সেটার। এই স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা ৬০ হাজারের বেশি। আছে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। এগুলোর কাছেই শেষ পর্যন্ত হেরে গেল ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়াকা গ্রাউন্ড। ওয়াকায় এখন তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাই নেই। পুরো স্টেডিয়ামে বাথরুম মাত্র চারটি। সেগুলোতে ঢুকতে হলে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। খেলার সময় খাবার কিনতে গেলে ফিরে আসতে আসতে হয়তো খেলাই শেষ হয়ে যায়। গ্যালারির বেশিরভাগ অংশেই ছাদ নেই। তাই খেলা দেখতে এসে রোদে পুড়ে বাড়ি ফিরতে হয় ক্রিকেট ভক্তদের। বয়সের সাথে সাথে আক্ষরিক অর্থেই মরচে পড়ে গেছে ওয়াকায়।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এবং ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য দাবি করছে, ওয়াকায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট একেবারেই শেষ হচ্ছে না। শুধু বড় ম্যাচগুলো খেলা হবে পার্থ স্টেডিয়ামে। ক্রিকেটে টেস্ট পরিবারের নতুন দুই সদস্য আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ডের সাথে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচগুলো হবে ওয়াকাতেই। অবশ্য এই বক্তব্যের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ নতুন এবং অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম থাকতে এখানে ম্যাচ দেখতে দর্শকরা কেন আসবেন? তাই বলে দেয়া যায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিদায়ই নিলো ওয়াকা থেকে।

ওয়াকা থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিদায় নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে এক দর্শক বললেন, ‘তৃতীয় টেস্টের প্রথম দিন (অ্যাশেজের) জশ হ্যাজলউডের একটি স্পেল দেখে আবার ওয়াকার প্রেমে পড়ে গেছি। আপনি ক্রিকেটভক্ত হলে ওয়াকার প্রেমে পড়বেনই। এরকম পেস এবং বাউন্স এখনো বিশ্বের কোনো পিচে দেখা যায় না। বিষয়টি খুব আবেগের। কিন্তু সত্য হলো, ওয়াকায় সুযোগ-সুবিধার অবস্থা জঘন্য। মাঠে এসে খেলা দেখা খুবই কঠিন।’ আরেকজন বললেন, ‘আমার ক্রিকেটপ্রেমের একটা অংশ মারা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’

ওয়াকার সর্বশেষ টেস্টটিও ঘটনাবহুল। ম্যাচটি শুরু হয়েছিল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের গুজব দিয়ে। ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’ দাবি করেছিল, দীর্ঘদিনের অনুসন্ধান শেষে তারা অ্যাশেজে ফিক্সিং প্রচেষ্টা উদঘাটন করেছে। এই ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত এক বুকি তাদের ‘স্টিং’ অপারেশনের ফাঁদে পা দিয়ে তাদেরকে এই খবর দিয়েছে। তাদের দাবি, এই ঘটনার সাথে বর্তমান এবং সাবেক ক্রিকেটাররা জড়িত। বিশ্বকাপজয়ী একজন অলরাউন্ডারও নাকি এই ফিক্সিংয়ের সাথে জড়িত। সংবাদমাধ্যমটির এই দাবির পরই তদন্ত শুরু করে আইসিসি। সেই তদন্তে এর সত্যতা পাওয়া গেছে কীনা, সে ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি আইসিসি।

অবশ্য ফিক্সিং গুজব চাপা পড়ে যায় ইংল্যান্ডের বাজে পারফরমেন্সে। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে আগেই ২-০তে এগিয়ে থাকা অজিরা তৃতীয় টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে ইংলিশদের হারিয়ে অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার করে। তৃতীয় টেস্টের শেষ দিনটাও ছিল ঘটনাবহুল। রৌদ্রতপ্ত ওয়াকায় এই প্রথম বৃষ্টির কারণে খেলা থামাতে হয়েছে। বৃষ্টি বাধায় তিন ঘন্টা দেরিতে শুরু হয়েছিল শেষ দিনের খেলা। তাতে অবশ্য বৃষ্টির চেয়ে কিউরেটারদেরই বেশি দোষ। তাদের অমনোযোগের কারণেই পিচের উপরের কাভার সরে গিয়ে ভিজে গিয়েছিল উইকেট। ভেজা উইকেটের কারণে শেষ দিনের খেলা অনেকটাই রং হারিয়েছিল।

ওয়াকা থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সরে যাওয়ায় ইংল্যান্ড অবশ্য খুশিই হবে। গত প্রায় ৪ দশক ধরে ওয়াকা যে তাদের শশ্মানঘাটে পরিণত হয়েছিল! ১৯৭৮/৭৯ অ্যাশেজ থেকে এখন পর্যন্ত একটি অ্যাশেজ ম্যাচও এখানে জিতেনি ইংল্যান্ড।

নতুন পার্থ স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু হবে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ওয়ানডের মধ্য দিয়ে, জানুয়ারির ২৮ তারিখে। আগামি বছরের নভেম্বরে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ দিয়ে হবে টেস্টের উদ্বোধন। তবে পার্থের নতুন স্টেডিয়ামকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ওয়াকার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও এই মাঠের পিচ ছিলো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পিচগুলোর একটি। নতুন স্টেডিয়ামের উইকেট ওয়াকার আদর্শ বিকল্প হতে পারবে কীনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

প্রশ্ন ওঠার কারণও আছে। নতুন স্টেডিয়ামে শুধু ক্রিকেটই খেলা হবে না। এটি রাগবি ও বেসবলেরও স্টেডিয়াম। এই মাঠে তাই স্থায়ী কোনো পিচ নেই। ম্যাচের আগে বাইরে থেকে পিচ তৈরি করে এনে মাঠে বসানো হবে। এ ধরনের পিচকে বলা হয় ‘ড্রপ-ইন’ পিচ। অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি লিগ, বিগ ব্যাশের একটি ম্যাচ দিয়ে এই মাঠে ক্রিকেটের উদ্বোধন হয়েছে। সেই ম্যাচে পার্থের উইকেটকে অনেক মন্থর মনে হয়েছে।

নতুন এই স্টেডিয়ামের মতোই ওয়াকার ব্যবহারও একসময় বহুমুখী ছিল। এই মাঠে বেসবল, রাগবি এমনকি ফুটবলও খেলা হয়েছে। নানা কারণে ক্রিকেট ছাড়া একে একে সব ধরণের খেলা সরে যায় ওয়াকা থেকে। এরপর পুরোপুরি ক্রিকেট খেলার স্টেডিয়াম হয়ে দাঁড়ায় ওয়াকা।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলা হলেও ওয়াকায় চলবে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শ্রেণির ম্যাচগুলো। বিগ ব্যাশ লিগে পার্থ স্কোরচার্সের হোম গ্রাউন্ডও হয়ে থাকবে এই মাঠ।

print