টেন্ডুলকার কথন: ঘৃনা থেকে ভালোবাসার গল্প

জয়াদিত্ত গুপ্ত: এক অর্থে, দোষটা আমারই। সত্তরের দশকে জন্মানো ছেলে হিসেবে আমি ভারতকে বৈশ্বিক কোনো প্রতিযোগিতায় জিততে দেখে অভ্যস্ত ছিলাম না। তার সাথে বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের আটপৌরে মানসিকতা যোগ হওয়াতে যা হয়েছিল, তা হলো আমি কোনো ধরণের বস্তুগত সাফল্য পছন্দ করতে পারতাম না। সুনীল গাভাস্কারের রেকর্ড ভাঙ্গা রানের বিপক্ষে গুনদাপ্পা বিশ্বনাথের এক পশলা শিল্প কিংবা কপিল দেবের প্রায় ভাববিলাসি ফুর্তিবাজি? আমার কাছে তুলনাই হয় না!

শচীনের রান ছিল। শিল্পও ছিল। তার জেগে উঠাটা প্রায় গান্ধীর সাথে তুলনীয়। মুখে স্কুলে পড়া বাচ্চাদের মতো মুচকি হাসি, ভয়ংকর বোলিং কিংবা অসম্ভব বাজে স্লেজিংয়ের সামনে দাঁড়িয়েও ভাবলেশহীনভাবে খেলে যাওয়া, যেনো এগুলো তাকে ছোঁয়ার যোগ্যই নয়। তার এই আচরণ প্রতিপক্ষকে আরো রাগিয়ে দিত। আমার তাকে শুরু থেকেই পছন্দ করা উচিত ছিল। কিন্তু তার মাঝে আমি আমার দেশের প্রতিফলন দেখতে পেতাম। যেভাবে আমার দেশ টেন্ডুলকারের মতোই একটি ঘুমন্ত দক্ষিণ এশিয়ান শক্তি থেকে ক্রিকেট বিশ্বের নেতা হয়ে উঠছিল। টেন্ডুলকারকে ভালোবাসবো? প্রশ্নই উঠে না!

আমাদের ক্যারিয়ার প্রায় একই সময়ে শুরু হয়। আমার প্রথম চাকরি পাওয়ার ঠিক এক মাস পরে ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে তার টেস্ট অভিষেক হয়। তার আগে টেন্ডুলকার তার রঞ্জি অভিষেকে সেঞ্চুরি করে এবং বিনোদ কাম্বলির সাথে সেই বিখ্যাত বিশ্ব রেকর্ড জুটি করে সাড়া ফেলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তখন তার থেকেও বড় তারকা ছিলেন বিশ্বনাথ আনন্দ। টেন্ডুলকারের টেস্ট অভিষেকের আগেই এই তরুণ গ্র্যান্ডমাস্টার বিশ্ব দাবার জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। আরো ছিলেন লিন্ডার পায়েস, যিনি টেন্ডুলকারের অভিষেকের পরপরই জুনিয়র উইম্বলডন জিতেছিলেন। সামাজিক মাধ্যম না থাকার সেসব রূপালী দিনে শচীন শুধু বম্বেরই তারকা ছিলেন। দেশের অন্য অংশের মানুষ তার সাথে সেভাবে পরিচিত ছিল না।

তার প্রতিভার ঝলক প্রথম থেকেই দেখা যেত। প্রথমবার ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশে ট্যুরে গিয়েই সেঞ্চুরি, এসব তার প্রমাণ। তবে তার বেড়ে উঠার ধীরে ধীরেই হচ্ছিল। মাঝে মাঝে জ্বলে উঠা, যা অন্যরকম প্রতিভার জানান দিতো আমাদেরকে। সেসব দুর্দান্ত পারফর্মেন্স আমরা তখনো উদযাপন করতে শিখি নি। বরং আমরা তখন শচীনকে সমাদর করেই সন্তুষ্ট থাকতাম, পুরনো হইস্কির স্বাদ পেলে মানুষ যা করে আরকি।

এরপরেই কিছু একটা বদলে গেল। টেন্ডুলকারের ব্যাটিং মানুষকে আরো আকৃষ্ট করতে লাগলো। কারণও আছে। টেস্টে প্রথম চার বছরে তার সেঞ্চুরি ৬টি, তারপরের চার বছরে ৭টি। এরপরের চার বছরে তার সেঞ্চুরি ১৩টি। তার ওয়ানডে ব্যাটিং আর চোখ কপালে তুলে দেয়, একই বারো বছর সময়ে তার সেঞ্চুরি সংখ্যা ৩১টি।

আমার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ বছরে আমাকে ভারতের নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। সব শহরেই একটি বিষয় সর্বজনীন। টেন্ডুলকার ভালো খেললে শহরের চেহারাও পাল্টে যেত।

একই সাথে ভারতের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সেই প্রথম যুগে ভারতে যেসব শিল্প জায়গা করে নেয় তাদের মাঝে অন্যতম একটি কেবল টিভি। ২৪ ঘন্টার খবর এবং খেলার চ্যানেল মানুষের আয়ত্তে চলে আসে। দুটিই মানুষকে তারকা বানানোর কাজে শিদ্ধ। প্রায় একই সময়ে ভারতীয়দের বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা কিংবা কাজ করার সংখ্যা বেড়ে গেলো। এই ভারতীয়রা ইন্টারনেট হাতে পেল, এবং ক্রিকেটবিশ্বের সাথে আরো যুক্ত হলো।

তখন এই ছোটখাট প্রশংসা, সমাদর হঠাৎ করেই টেন্ডুলকারের জন্য কম মনে হতে লাগলো। শিল্পায়নের প্রথম যুগে মানুষের সবকিছু নিয়েই উৎসাহ বেশি থাকে। আর নিজের দেশকে ঘিরে এদেশের মানুষের উৎসাহ প্রায় একটি সর্বভুক সর্বশক্তিমান শক্তিতে পরিণত হলো। নিজের দেশই শ্রেষ্ঠ, এটাকে প্রমাণ করা তখন ভারতীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এটি একেবারেই নতুন। আর সেটা করতে টেন্ডুলকারের থেকে বড় উপকরণ আর কী হতে পারে? ক্রিকেট তখন একটি ধর্ম হয়ে গেলো, আর টেন্ডুলকার দেবতা হয়ে দাঁড়ালেন।

শচীন ভারতীয়দের কাছে ছিলেন একটি খোলা ক্যানভাসের মতো, যাতে মনের মতো রঙ মাখানো যায়

১৯৯৬ সালে ভারত দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সহআয়োজক ছিল। প্রথমবার করে ছিল মাত্র ৯ বছর আগে, ১৯৮৭ সালে। কিন্তু ৯৬ সালে বিষয়টি একেবারেই অন্যরকম ছিল। ৮৭ সালে ভারত শুধু বিশ্বক্রিকেটের শ্রেষ্ঠ দল হওয়ার দাবিদার, সেকেলে অবকাঠামো আর প্রাচীন রীতিনীতির একটি মধ্যবিত্ত দেশ। ৯৬ সালে সে একই দেশ নতুন যুগের সম্ভাব্য নেতা। তারপরের দুই বছরে টেন্ডুলকার আর ভারত যেন একসাথে জেগে উঠলো। পোখরানে বিশ্বনেতাদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে নিউক্লিয়ার পরীক্ষা, এক বছর পরে কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানকে হারানো- সবমিলিয়ে বিশ্ব তখন জানে, ভারতকে আর ‘ভারত’ নেই।

১৯৯৯ সালে আরেকটি ছোটখাটো আরেকটি ঘটনা ভারতের জেগে উঠার জানান দেয়। বিবিসির অনলাইনে পর্দার সবচেয়ে বড় তারকা কে?- এমন একটি জরিপে সবাইকে টপকে অমিতাব বচ্চনের নাম উঠে আসে। এরকম জরিপে ভারতীয়দের শাসন তখন আরো সাধারণ হয়ে উঠে। শতকের সেরা শ্রেষ্ঠ স্পোর্টসপার্সন কে, এমন জরিপে দেখা যায় গাভাস্কার তিনে, শচীন পাঁচে এবং কপিল সাতে। এক নম্বরে মোহম্মদ আলিকে অবশ্য কোনোভাবেই ফেলা যায় নি।  

প্রথম হয়ে উঠার ভারতীয়দের এই লড়াই ক্রিকেট মাঠেও চলতে লাগলো। তার প্রমাণ পোর্ট এলিজাবেথে ম্যাচ রেফারি মাই ডেনিস টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে টেম্পারিংয়ের অভিযোগ উঠানোর সাথে সাথে সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়া, আর তৎকালীন বোর্ড সভাপতি জগমোহন ডালমিয়ার সেটাকে সমর্থন জানানো। বোঝা গেল, ভারত আর সবকিছুই মেনে নিতে রাজি নয়। পরদিনের দ্য হিন্দুর হেডলাইন শুনলেই বুঝবেন- ‘ডেনিস ভেবেছিলেন, তার পূর্বপুরুষদের মতোই তিনি ভারতকে আবার শাসন করবেন।’

এবার আর পিছে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। বিশ্বজয় করতেই হবে। তার ফলে যা হলো, প্রতিটি ছোটখাট সাফল্য, সে যে বিভাগেই হোক না কেন, বিশ্বজয়ের পথে একটি ধাপ বলে মনে হতে লাগলো। আর আমাদের বিপক্ষে কেউ কিছু করলে, দেশের অপমান মনে হতে লাগলো। ভারতের ম্যাচ প্রতিটি মানুষের কাছে একটি লড়াইয়ের মতো, সেই বিখ্যাত ব্যান্ড কুইনের গানটির মতো- ‘নো টাইম ফর লুজারস।’

এই পুরো প্রক্রিয়াটার মাঝেই আমি টেন্ডুলকারকে খুঁজে পেতে লাগলাম। আর ভারতের এই মানসিকতার মাঝে টেন্ডুলকারকে। এভাবেই আমার ক্রিকেটপ্রেম কেটে যেতে লাগলো, আমি টেন্ডুলকারকে অপছন্দ করা শুরু করলাম। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে আমার নিরপেক্ষ থাকা উচিত, আমি তাই থাকার চেষ্টা করলাম। অন্যদিকে আমার কলিগরা ভারতকে সমর্থন না করাটা প্রায় অসম্ভব মনে করতো। আমি নিজেকে বোঝালাম, আমিই ঠিক পথে আছি। স্পোর্টস ডেস্কে আমি না থাকলে তা উচ্ছন্নে যেত, এমন মনোভাব থাকাতে আরো উৎসাহিত বোধ করতাম। টেন্ডুলকার অসফল বিশ্বকাপ মিশনেও আমার কিছু যায় আসে নি, চেন্নাইয়ে তার সেই বিখ্যাত টেস্ট জয়ের সেঞ্চুরিতেও আমি ভাবলেশহীন। অজিদের মতো আমিও তার দলকে জয় এনে দেয়ার ক্ষমতায় ক্রুদ্ধ হতাম।

বিশ্বের বড় বড় স্পোর্টস লেখক তাকে যখন প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে, তখনো আমার বিশ্বাস হতো না। বচ্চন যদি সেই শতকের পর্দার শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে নির্বাচিত হন, তাহলে যেকোনো কিছুই হতে পারে!

খুব বেশি কঠিন ছিল না। কারণ আমার স্পোর্টসের নেশা পূরণের জন্য অন্য অনেক কিছু ছিল। যেই ২৪ ঘন্টার স্পোর্টস চ্যানেলগুলো ক্রিকেটারদের মিডিয়ার দানব করে তুলতো তারাই আমার সামনে প্রিমিয়ার লিগ এনে দিল। আমার প্রথম প্রেম ফুটবল আমার আয়ত্তে চলে এলো। টেন্ডুলকার আমার সামনে চেলসির জার্সি পরে ঘুরছেন, এটা দেখলেও আমার রাগ উঠে যেত।

কিন্তু আমার মানসিকতা বদলাতে বাধ্য হলাম। আগেই বলেছি, আমার কর্মজীবনের প্রথম ২০ বছরে আমাকে ভারতের নানা অংশে যেতে হয়েছে। আহমেদাবাদ বলুন, কিংবা বদোদারা, চন্দিগড়, নিউ দিল্লী অভবা ব্যাঙ্গালোড়, ভাষা বদলাতো, আবহাওয়া, কিংবা জীবনের ধারা, সব বদলে যেত। শুধু একটি বিষয়ই সবখানে উপস্থিত, টেন্ডুলকার ভালো খেললে যাই হোক না কেন, পুরো একটি শহর কেমন যেন একটি উৎসবমুখর মুডে চলে যেত। তার ব্যাট যেন একটি জাদুর কাঠি, তা যতো দুঃখ-কষ্ট সব সরিয়ে সব শ্রেণীর মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতো। তার কাজ ভারতকে জেতানো ছিল না, তার কাজ ছিল শুধু ভালো খেলা। বাকিটা এমনিতেই হয়ে যেত।

এটি এতো চমৎকার একটি দৃশ্য ছিল, একেবারে খাটি, যার মাঝে বিন্দুমাত্র নেতিবাচকতা নেই। যদিও এই বিষয়টিতে কোনো একজন বোলারকে মার খেতে হতো, তবুও সবার কাছে তা ছিল একটি ছোট বাচ্চার মতো পবিত্র। সে কারণেই দুটো ইনিংস আমার কাছে সেরা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুটোই ভারতের উপর দুটি বড় আঘাতের পর, প্রায় ১৫ বছরের ব্যবধানে। দুটোই তার নিজের শহর মুম্বাইকে ঘিরে, দুটোই চেন্নাইয়ের মাঠে। ৯৩ সালে দেশের মাটিতে তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। ১৬৫, যাতে ২৪টি চার এবং একটি ছয় ছিল। সেই সেঞ্চুরিটি তার মুম্বাইয়ে দাঙ্গা হওয়ার পরপর যেন একটি প্রশান্তির ছোঁয়া হয়ে এসেছিল। আর ২০০৮ সালে, মুম্বাইয়ে জঙ্গি হামলার মাত্র ১৫ দিনের মাথায় তার অপরাজিত সেঞ্চুরি ভারতকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় এনে দেয়। ট্র্যাজেডির আঘাত সামলে এমন শীতল শান্ত ব্যাটিং মুগ্ধ না করে পারে না।

খুব কম স্পোর্টসম্যানই এতটা ভালোবাসা পেয়েছেন। এমনকি তার প্রতিপক্ষও তাকে ঘৃণা করেছে, এমন উদাহরণ পাওয়া কঠিন। প্রতিপক্ষেরও ভালোবাসা পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব, ক্রীড়াবিদরা অবসর নেয়ার সময়ের আগে পান না সাধারণত। তখন সবাই ভালোবাসতে রাজি, তখন তো আর নিজের ক্ষতির সুযোগ নেই। খুব সম্ভবত একা টেন্ডুলকারই এখানে ব্যতিক্রম। তার সময়ে একদম লড়াইয়ের মাঝেই প্রতিপক্ষ তাকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়েছিল, যখন তিনি প্রতিপক্ষ বোলারদেরই তুলোধুনো করছিলেন।

কিছু কিছু সময়ে তিনি যে তার সাধনার থেকে চ্যুত হননি তা নয়। কিন্তু আমরা তার গাড়ির ট্যাক্স বাতিলের চেষ্টা, রাজ্যসভায় থাকার সেই বাজে সময়টা কিংবা ভারতরত্ন পাওয়ার পরেও কর্মাশিয়ার অ্যাড নিয়ে কথা বলি না, কারণ আমরা তাকে মানুষ মনে করি, যার সাধনায় ত্রুটি থাকতেই পারে।

ধারাভাষ্যকার কিংবা কোচ কোনোটাই নয়, টেন্ডুলকার নিজের দায়িত্বটা শেষ করেই চলে গেছেন। লাইমলাইট থেকে তিনি এখন এতটাই দূরে যে হার্দিক পান্ডিয়া আর কেএল রাহুল টেন্ডুলকারের উপরে কোহলিকে পছন্দ করেছেন। এখন তার জায়গায় নতুন দেবতারা চলে এসেছেন, অসাধারণ সব রূপকথা তৈরি করছেন, নতুন রেকর্ড ভাঙ্গছেন-গড়ছেন।

কিন্তু আমি টেন্ডুলকারের যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, তা হলো তিনি এতগুলো বছরে একটিবারের জন্যও আমার মতো মানুষদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেন নি। পার্থক্যটি এখানেই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ক্রিকইনফো, ভারত।

ক্রিকইনফো থেকে অনুবাদ করেছেন রাহিন আমিন

print