ভবিষ্যতের নগরী : সকালে যেভাবে কাজে ছুটবে মানুষ

বিবিসি : বিশ্বজুড়েই শহরগুলোতে মানুষ বাড়ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৭০ শতাংশ মানুষই থাকবে শহরে। এখনই যানজটে অতিষ্ঠ নগর জীবন। তখন বড় বড় নগরীগুলোতে কীভাবে চলাচল করবে মানুষ? প্রযুক্তি এক্ষেত্রে আশার আলো দেখাচ্ছে।

‘ড্রাইভারলেস কার’ বা চালকবিহীন গাড়ি যা নিজে থেকেই চলবে, সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেকদূর এগিয়েছে। ‘জেটপ্যাক’, যা এক সময় ছিল বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, সেটাও বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। শহরগুলোর যানজট কমাতে আরও নানা ধরণের ‘স্মার্ট প্রযুক্তি’ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

জেটপ্যাক

‘জেটপ্যাক হবে ভবিষ্যতের নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহন’- বলেছেন কুয়াংচি সায়েন্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিটার কোকার। মার্টিন এয়ারক্রাফট কোম্পানির বড় শেয়ারহোল্ডার এই কোম্পানি। ‘বলতে পারেন এটা হবে আকাশে উবার ট্যাক্সির মতো। স্মার্টফোনের অ্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ জেটপ্যাক ডাকতে পারবে। তারপর জেটপ্যাক আরোহীকে নিয়ে আকাশে উড়বে।’

নিউজিল্যান্ডভিত্তিক মার্টিন এয়ারক্রাফট কোম্পানি ইতোমধ্যে জেটপ্যাকের একটা প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে যেটি মাটি থেকে দুহাজার আটশো ফুট উঁচু দিয়ে ঘন্টায় ২৭ মাইল বেগে ২৮ মিনিট ধরে চলতে পারে।

তবে শহরগুলোর আকাশ জুড়ে শত শত জেটপ্যাক যখন উড়ে বেড়াবে, তখন এগুলোর মধ্যে যে মাঝে-মধ্যেই ধাক্কা লাগবে, সেটা স্বীকার করছেন তিনি। কাজেই এই সমস্যার সমাধানে এগুলোর চলাচলের নিয়ম-নীতি তৈরি করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধী কোন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা উদ্ভাবনের দরকার হবে।

পরীক্ষামূলকভাবে জেটপ্যাক চালিয়েছেন এমন একজন পাইলট মাইকেল রীড অবশ্য মনে করেন, জেটপ্যাক নগরীগুলোতে চলাচলের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। ‘জেটপ্যাকে আপনি অবাধে উড়ে যেতে পারেন, এটা খুবই মজার অভিজ্ঞতা।’

চালকবিহীন কার

বিশ্বের সব বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই এখন ‘ড্রাইভারলেস কার’ বা চালকবিহীন কার তৈরির জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। অনেক গাড়ি ইতোমধ্যে সফলভাবে রাস্তায় পরীক্ষাও করা হয়েছে। ২০২০ সাল নাগাদ এরকম গাড়ি যে বিশ্বের অনেক দেশের রাস্তাতেই দেখা যাবে, সে ব্যাপারে সবাই মোটামুটি একমত।

চালকবিহীন গাড়ির সুবিধে হচ্ছে, একই গাড়ি বহু মানুষ ব্যবহার করতে পারবে। যেহেতু কোন ড্রাইভার দরকার হচ্ছে না, তাই গাড়িটি বসে না থেকে সারাক্ষণ যাত্রী টানতে পারবে। এতে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। কমে আসবে গাড়ি চালানোর খরচও।

এক জরিপ অবশ্য বলছে, ২৩ শতাংশ আমেরিকান এখনো চালকবিহীন গাড়িতে চড়তে চান না। অন্যদিকে ৩৬ শতাংশ গাড়িতে উঠতে রাজী থাকলেও সারাক্ষণ স্টিয়ারিং হুইলের দিকে তাকিয়ে থাকবেন এই ভয় নিয়ে- যদি কিছু ঘটে! অনলাইন ট্যাক্সি কোম্পানি উবার তো এই চালকবিহীন গাড়ি নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে। তারা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহরে এরকম চালকবিহীন ট্যাক্সি বহর নামিয়েছে। সেখানে এই পরীক্ষা সফল হলে বদলে যেতে পারে আমেরিকার অনেক শহরের পরিবহন ব্যবস্থার চিত্র।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন, লাস ভেগাস আর ফ্লোরিডায় ১২ আসনের ছোট চালকবিহীন বাস চালুর পরিকল্পনা চলছে। আইবিএএম তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম দিয়ে চালাবে এসব বাস। যাত্রীদের নাকি বাস নিজে থেকে দর্শনীয় স্থান এবং ভালো খাবার পাওয়া যায় এমন রেস্টুরেন্টের খবরও দিতে পারবে! এ বছরের নভেম্বরে এই বাসের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হবে।

হাইপারলুপি

ভবিষ্যতের বাহন হিসেবে যেটি সবচেয়ে বেশি চমক সৃষ্টি করতে পারে, সেটি হলো ‘হাইপারলুপি। সিলিকন ভ্যালীর বিখ্যাত উদ্যোক্তাদের একজন এলন মাস্ক এই সুপার ফাস্ট গণপরিবহণ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। মূলত একটি টিউবের ভেতর দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটবে কিছু ক্যাপসুল। বুলেট ট্রেন যেভাবে দ্রুত মানুষকে অনেক দূরের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে, হাইপারলুপি ঠিক সেই কাজটাই করবে স্বল্প দূরত্বের জন্য।

কিন্তু কেবল যানজটের সমস্যা থেকে রক্ষা পেতে এরকম ব্যয়বহুল প্রকল্পের দরকার আছে কীনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। ম্যাসাচুসেটস ইনষ্টিটিউট অফ টেকনোলজির সেনসিটিভ সিটিস ল্যাব- এর প্রধান কার্লো রাট্টির প্রশ্ন, ‘আমাদের কি আসলেই একটা অন্ধকার টিউবে চেপে এরকম স্বল্প দূরত্ব ভ্রমণের কোনো দরকার আছে?’

print