২০১৭ : উড়ন্ত টাইগারদের মাটিতে নেমে আসা

রাহিন ফাইয়াজ : শ্রীলঙ্কা সফরে বাংলাদেশের শততম টেস্ট জয়ের পিছনের রহস্য একটি টিম মিটিং। গলে প্রথম টেস্টে ২৫০ রানে পরাজিত হতাশ টাইগাররা যখন ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ছিলেন, ক্রিকেটারদের উপর বেশ চটেছিলেন সদ্য সাবেক বাংলাদেশের প্রধান কোচ চান্দিকা হাথুরুসিংহে। রেগে গিয়ে খেলোয়াড়দের বলেছিলেন, ‘এখন তোমরা কী করবে সেই সিদ্ধান্ত তোমরাই নাও।’ কোচের এই কথার জের ধরে পরের দিনই ক্রিকেটাররা বৈঠকে বসেছিলেন। ঘন্টা দেড়েক পর সেখান থেকে বের হয়ে কোচকে টাইগাররা জানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা এবার ভিন্ন কিছু করবেনই। সেই প্রত্যয়ের ফলই ঐতিহাসিক শততম টেস্ট জয় এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ ড্র।

সেটি ছিল ২০১৭ সালের মার্চের ঘটনা। বছর শেষে এখন আবার মনে হচ্ছে, এরকম টিম মিটিং আরো লাগবে বাংলাদেশের। দক্ষিণ আফ্রিকায় বছরের শেষ সিরিজে ক্রিকেটানুরাগীদের চরম হতাশা উপহার দিয়েছেন টাইগাররা। এই সফরে চূড়ান্ত বাজে পারফরমেন্সের কারণেই বেশ কয়েকটি পালাবদলের মধ্য দিয়ে গেছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। টেস্ট অধিনায়কত্ব হারিয়েছেন মুশফিকুর রহিম, পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের সেরা সময়ের কোচ হাথুরুসিংহে। টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিব আল হাসান টেস্টেও অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তবে হাথুরুসিংহের বিকল্প এখনো খুঁজছে বিসিবি।

কাকতালীয়ভাবে নতুন বছরে টাইগারদের প্রথম প্রতিপক্ষ লঙ্কানরাই। সেই লঙ্কার প্রধান কোচ এখন হাথুরুসিংহে। ঘরের মাটিতে ১৫ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কা এবং জিম্বাবুয়েকে নিয়ে শুরু হচ্ছে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ। এরপর আছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট এবং টি-টোয়েন্টি সিরিজ। নতুন বছরে অনেকটা নতুনই এই বাংলাদেশ যদি আবার একটি দলীয় বৈঠক করে শততম টেস্টের ফর্ম ফিরিয়ে আনতে পারে, তাতে ক্ষতি কি?

বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ২০১৭ সালটিকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। হতাশা-সাফল্য-হতাশা। বিদায়ী বছরটা মন খারাপের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল টাইগারদের। ২০১৬ সালের শেষ দিনটিতে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কিউইদের কাছে ওয়ানডে সিরিজে তৃতীয় ওয়ানডেতে হেরে হোয়াইওয়াশ হয়েছিল তারা।

পরাজয়ের এই ধাক্কা বছরের প্রথম দুই মাসে কাটিয়ে উঠতে পারেনি তামিম-সাকিবরা। ওয়ানডে সিরিজ ছাড়াও একই সফরে টি-টোয়েন্টি এবং টেস্ট সিরিজেও সবগুলো ম্যাচই হেরেছিল বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশের একমাত্র বলার মতো সাফল্য, ওয়েলিংটনে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫৯৪ রান করা। সেই ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন সাকিব আল হাসান। ওয়েলিংটনে টেস্টে সর্বোচ্চ দলীয় রানও এটি। কিন্তু তাতেও হার এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। টেস্টে কোনো ইনিংসে এতো বেশি রান করে কখনো হারেনি কোনো দল। এর আগের রেকর্ডটি ছিল পাকিস্তানের।

এরপর ছিল ভারতের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট। ভারতের মাটিতে এটি ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। আইসিসির নানা বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে খেলতে গেলেও এর আগে ১৭ বছরেও ভারতে কখনো শুধু ভারতের সাথে সিরিজ খেলতে যায়নি টাইগাররা। নিউজিল্যান্ডের মতো হতাশা ছিল ভারতেও। হায়দারাবাদে বাংলাদেশ হারে ২০৮ রানে।

মার্চে শ্রীলঙ্কা সফরে এক নতুন শুরুর মনোভাব নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন সাকিব-মুস্তাফিজরা। কিন্তু এই সফরের প্রথম টেস্টেও বড় ব্যবধানে পরাজয় মেনে নিতে হয় টাইগারদের। তাতে নড়েচড়ে বসে পুরো বাংলাদেশ। চরম সমালোচনা শুরু হয় পুরো দেশজুড়ে। প্রশ্ন উঠে, টাইগারদের এই দশা কেন?

কলম্বোয় দ্বিতীয় টেস্টটা ছিল বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচ। ঐতিহাসিক ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখতেই হয়তো সেই ম্যাচে দেখা গেল ফর্ম ফিরে পাওয়া পুরনো বাংলাদেশকে। পুরো ম্যাচজুড়েই শরীরি ভাষাতেও এগিয়ে ছিল টাইগাররাই। ম্যাচটিতে চার উইকেটের সহজ জয় পায় তারা। গত বছর বাংলাদেশের সাফল্যের শুরুটা এই টেস্ট দিয়েই। এরপর একটি ওয়ানডে এবং একটি টি-টোয়েন্টি জিতে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজও ড্র করে টাইগাররা।

হতাশা কাটিয়ে কলম্বো থেকেই বদলাতে শুরু করে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। নিউজিল্যান্ড সফর থেকে বাজে ফিল্ডিং নিয়ে চরম ভুগছিল বাংলাদেশ। শুধু নিউজিল্যান্ড সফরেই সব মিলিয়ে ২০টি ক্যাচ ফেলেছিল টাইগাররা। ভারতেও ছিল একই অবস্থা। স্লিপের ক্যাচগুলো নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে বারবার। পুরো দলের সবচেয়ে ভালো ফিল্ডার বলা হয় সৌম্য সরকার এবং ইমরুল কায়েসকে। তারাও বেশ কয়েকটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ফেলেছেন। উইকেটকিপিং নিয়ে ভুগছিলেন মুশফিকুর রহিমও। মুশফিকের উপর চাপ কমাতে শ্রীলঙ্কা সফরে উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব লিটন এবং নুরুল হাসানকেও দেয়া হয়।

শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে হঠাৎই টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দিয়ে বসেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। টি-টোয়েন্টির অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দেয়া হয় সাকিব আল হাসানকে।

শ্রীলঙ্কা সফরের পর ডাবলিনে আয়ারল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ। টানা তিন ম্যাচ জিতে সিরিজটি নিউজিল্যান্ড নিজেদের করে নিলেও টাইগাররা খারাপ খেলেছে, এমন বলা যাবে না। সিরিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, মাত্র কয়েক মাস আগেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হওয়া টাইগাররা বিদেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয় তুলে নেয়।

এই সিরিজে বাংলাদেশও চ্যাম্পিয়ন হতে পারতো। হয়নি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায়। চার ম্যাচের দুটিতে জিতেছে বাংলাদেশ। এই সিরিজের পর র‍্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাসের সেরা স্থানে উঠে আসে টাইগাররা। ছয়ে উঠে যাওয়াতে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের সরাসরি বিশ্বকাপ খেলা।

২০১৫ এবং ২০১৬ সালের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে এই প্রথম সরাসরি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। গুরুত্বের দিক থেকে গত বছর বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য- জুনে চ্যাম্পয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ওঠা। তাতে অবশ্য ভাগ্যের সহায়তাও ছিল খানিকটা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটি পরিত্যক্ত না হলে হয়তো সেমিফাইনালে ওঠা হতো না টাইগারদের।

গত বছরের বেশিরভাগ ম্যাচই বিদেশের মাটিতে খেলেছে বাংলাদেশ। ঘরের মাটিতে টাইগারদের একমাত্র সিরিজ ছিল আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজ। এর আগে নিরাপত্তার অজুহাতে বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল অস্ট্রেলিয়া। এবারো অস্ট্রেলিয়ান বোর্ড এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে ঝামেলায় ঝুঁকিতে ছিল বাংলাদেশ সফর। অনেক নাটকের পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পা রাখে অজিরা। বিদেশের মাটিতে পারফর্মেন্সে যেমনই হোক না কেন, ঘরের মাটিতে বাংলাদেশের সামর্থ্য কতটুকু তা আবার প্রমাণ করে মুশফিকুর রহিমের দল। তামিম ইকবাল এবং প্রথম টেস্টে নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জয় তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

২০১৭ সালে বাংলাদেশের সাফল্যের গাঁথা এই পর্যন্তই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্ট থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পুরো সফরকে বলা যেতে পারে এই বছরে টাইগারদের হতাশার দ্বিতীয় অধ্যায়। চট্টগ্রামে দ্বিতীয় টেস্টে অজিরা খুঁজে পায় নিজেদেরকে। বাংলাদেশকে সাত উইকেটে হারিয়ে সিরিজ ড্র করে তারা।

বছরের শুরুর দিকের ফর্ম অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ফিরিয়ে নিয়ে আসে বাংলাদেশ। গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশ যেসব ম্যাচে হেরেছে, তার প্রায় প্রতিটির কারণই ছিল সুযোগ তৈরি করেও সেই সুযোগের ব্যবহার করতে না পারা।  কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের ম্যাচগুলোতে তেমন কোনো সুযোগই তৈরি করতে পারেনি তারা। বছরের শেষ সফরের প্রতিটি ম্যাচে স্বাগতিকদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে তারা। কোনো একটি ম্যাচেও বলা যায়নি লড়াই করে হেরেছে বাংলাদেশ। সেই সফর সামনে নিয়ে বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমের অবস্থা, প্রশ্ন তুলে চান্দিকা হাথুরুসিংহের কৌশল এবং কোচিংয়ের উপর। চাপের মুখে বেশ কয়েকবার সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম।

টাইগারদের জন্য বছরটা না পুরোপুরি সাফল্যের না একদম হতাশার। ২০১৭তে ১৪টি ওয়ানডে খেলে ৪টিতে, ৯টি টেস্ট খেলে ২টিতে এবং ৭টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১টি জিতেছে তারা। পুরো বছরটাই ছিল টাইগারদের বিদেশের মাটিতে পরীক্ষার বছর। সে পরীক্ষায় যে খুব ভালো মার্কস নিয়ে পাস করেছে তামিম-মুশফিকরা, সে কথা বলা যাবে না। এই বছর বাংলাদেশকে বাস্তবতার মুখোমুখি করিয়েছে। এ বছরও ফর্ম ফিরে পাননি সৌম্য। তামিমের একজন সুযোগ্য ওপেনিং পার্টনারের অভাবটা তাই বোঝা গিয়েছে ভালোভাবেই। বিদেশের মাটিতে চরম ব্যর্থ হয়েছে পেসাররা। বছরের বেশিরভাগ সময় নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডের মতো কন্ডিশনে খেলার পরও স্পিনাররা পেসারদের থেকে বেশি উইকেট নিয়েছেন। মুস্তাফিজের নিজেকে হারিয়ে খোঁজা তাকে ঘিরে অনেক স্বপ্নকেই ফিঁকে করে দিয়েছে। সাকিব-মুশফিক-মাহমুদুল্লাহর মিডল অর্ডারে নামের ভার অনেক থাকলেও অনেক ইনিংসেও বিপর্যিত হয়েছে। বিদায়ী বছরে নতুন এই বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশকে নতুন বছরে ভালো করতে হলে অতি দ্রুতই এসবের সমাধান বের করতে হবে।

print