ধোনি : দ্য মাস্টারক্লাস

রাহিন ফাইয়াজ: এটিই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত ওভারের ম্যাচে ভারত কারো বিপক্ষে রান তাড়া করলে, হয় কোহলি ম্যাচ জিতিয়ে ফিরবেন, নয় ধোনি। গত এক দশকের অলিখিত এই নিয়মের প্রমাণ চাচ্ছেন? দ্বিতীয় ইনিংসে রান তাড়া করে ভারত জিতেছে, এমন ম্যাচগুলোয় ২১টি সেঞ্চুরিসহ কোহলির গড় ৯৫.২৪। আর ধোনি প্রতি ম্যাচে গড়ে করেছেন ১০৫.২৫ রান। এমন ম্যাচগুলোর ৪৭টিতেই নট আউট থেকেছেন তিনি।

শনিবার হায়দ্রাবাদেও তাই হলো। ধোনির ৭২ বলে ৫৯ রানের ইনিংস এবং কেদার যাদবের ৮১ নট আউটের উপর ভর করে ১০ বল বাকি থাকতেই অস্ট্রেলিয়ার ২৩৭ রানের টার্গেট টপকে গেল ভারত। রানের হিসেবে যাদবের ইনিংসের থেকে কম রান করলেও ধোনির ইনিংসের গুরুত্ব কিন্তু মোটেই কম নয়। সঠিক সময়ে স্ট্রাইক ঘোরানো, কেদারকে তার মতো খেলার স্বাধীনতা দেয়া থেকে শুরু করে যখনই অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা চাপ তৈরি করেছে, চার মেরে ভারতকে আবার এগিয়ে দেয়া, সবকিছু মিলিয়ে ধোনির অভিজ্ঞতাই এই জয়ের পিছের প্রধান কারণ, তা বললে মোটেই ভুল হবে না।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন যাদব। ধোনির অভিজ্ঞতা এই ম্যাচে কেমন কাজে লেগেছে, সে প্রশ্নের জবাবে আসলে ফুটে উঠলো কিভাবে ধোনিতে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে পুরো ভারতের ড্রেসিংরুম। যাদব যেন ভাষাই হারিয়ে ফেললেন ধোনির ব্যাপারে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশে। ‘যখনই আমি তার সাথে ব্যাটিং করতে নামি, সময় কাটাই, আমি অনেক কিছু শিখি। এটা আসলে আপনাদের বুঝিয়ে বলা যাবে না।’

‘আমি ব্যাটিংয়ে নামার সময় তাকে দেখলে এক নতুন আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাই। সে এরকমই মানুষ। আপনি তাকে দেখবেন, তার সাথে কথা বলবেন, আপনার ভেতর নতুন এক শক্তি ভর করবে।’

একই মুগ্ধতা খুঁজে পাওয়া গেল অস্ট্রেলিয়ার উসমান খাঁজার কথায়ও। তিনি খুঁজতে চাইলেন ধোনির পারফর্মেন্সের পিছের রহস্য। ‘ধোনির যা করতে চায় তাই করতে পারে। গত তিনটি ম্যাচ দেখুন। সে শুধু মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের কাজটি করে গেছে। যখনই একটা বাউন্ডারির দরকার হয়, ধোনির ব্যাটে একটা চার বা ছয় আসবেই।’

খাঁজা গাড়ির কার্যপদ্ধতির সাথে খুঁজে পান ধোনির ব্যাটিংয়ের মিল। তার মতে, গাড়িতে যেভাবে গিয়ার পাল্টে ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে হয়, ধোনিও ঠিক সেভাবেই ব্যাটিং করেন। ‘সে প্রথমে একটি রান নিবে। আবার এক রান, এরপর দুই রান, এরপর একটি চার মারার চেষ্টা করবে। এভাবে হয়তো সবসময় হয়না, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সে সফল। এটাই অভিজ্ঞতা।’

২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারত ছিটকে পড়তেই অনেকে ধোনির শেষ দেখতে পেয়েছিলেন। এরপর অধিনায়কত্ব বদল, কোহলির হাতের নেতৃত্ব নিয়ে কত নাটকই না হলো! তাতে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। কিন্তু ধোনি সেই বিশ্বকাপ শেষেই বলেছিলেন, তিনি ২০১৯ বিশ্বকাপ খেলেই বিদায় দিতে চান ক্রিকেটকে। এখন দেখুন, বিশ্বকাপের আর মাত্র ৯০ দিন বাকি।

ধোনি তো আছেনই, আছেন কোহলিও। কোহলি বোধহয় এখনই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিনিশারদের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়ে ফেলেছেন। এই দুজনের কারণেই রান তাড়ার ক্ষেত্রে ভারত রীতিমত এখন এক অতুলনীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের বিপক্ষে যেভাবেই হোক টস জিতে বোলিং নেয়া এখন যেকোনো দলের জন্যে এখন আর ঠাট্টার বিষয় নয়, রীতিমত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‘এই যে ভারতের প্রতিটি তরুণ খেলোয়াড় ভালো খেলছে, তার পিছের কারণ ধোনি এবং কোহলি। দুজন যেন আমাদের আগলে রেখেছেন।’ কেদারের কথায় বোঝা গেল, ধোনির মাস্টারক্লাসটা শুধু রানের হিসেবে কিছুতেই বোঝা যাবে না।

কিন্তু শুধু রানের হিসেবেই তো ধোনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারদের মাঝে নিজের নাম নিয়ে গেছেন। সম্প্রতি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৩ হাজারি ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন তিনি। এই ক্লাবে ভারতের আর মাত্র তিনজন ক্রিকেটার আছেন। শচীন টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলী এবং রাহুল দ্রাবিড়। সাবেক ইংলিশ ক্রিকেটার গ্রাহাম গুচ ২২ হাজার রান নিয়ে এই তালিকার প্রথমে আছেন।

এই ম্যাচের ধোনি এবং যাদবের ১৪১ রানের পার্টনারশিপ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে ভারতের সর্বোচ্চ। হায়দ্রাবাদের রাজিব গান্ধী স্টেডিয়ামে এই জুটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই মাঠে সর্বোচ্চ ২০০৯ সালে শন মার্শ এবং শেন ওয়াটসনের ১৪৫ রানের জুটি।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ধোনি দাঁড়িয়ে আছেন আরেকটি ল্যান্ডমার্কের সামনে। আর মাত্র ৩৩ রান করলেই সব ফরম্যাট মিলিয়ে ১৭ হাজার রান করে ফেলবেন। ১৭ হাজারি ক্লাবে ভারতের ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে নাম লেখাবেন তিনি। তার আগে এই কীর্তি করেছেন শুধু শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, বিরাট কোহলি, সৌরভ গাঙ্গুলি এবং বিরেন্দর শেবাগ।

শুধু যাদব নয়, ধোনি বন্দনায় ব্যস্ত পুরো ক্রিকেটবিশ্বই। সম্প্রতি ভারত দলের নব্য পেস বোলার মোহাম্মদ সিরাজ জানিয়েছেন, ধোনি এবং কোহলি মিলে প্রতিটি বোলারের সাথে আলাদা করে সময় কাটান। সিরাজ বলেন, ‘কোহলি এবং ধোনি আমাদের সময়কে পুরো সিরিজজুড়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন। বিশেষ করে আমাকে প্রতি ক্ষেত্রে সাহস দিয়ে গেছেন তারা। নেটে আমাকে দরকারি সব টিপস দিয়েছেন। কোন অবস্থায় কী ধরণের বল করা লাগবে, কোন লেন্থে কখন বল করলে ভালো হয়, কী ধরনের ইয়র্কার কার্যকরী, এসব ছোটখাট বিষয়েও তাদের সাহায্য পেয়েছি আমি। তারা প্রতিটি বোলারকে আলাদা করে সময় দেন।’

পৃথ্বী শ’ ভারতের নতুন ব্যাটিং তারকা। ভারতের সমর্থকদের কাছে তিনি নতুন শচীন। তিনিও মুগ্ধ ধোনি-কোহলিতে। সম্প্রতি ইন্স্টাগ্রামে ভারতের দুই কান্ডারির সাথে ছবি আপলোড দিয়েছেন তিনি। ক্যাপশনে তাদেরকে ইংরেজিতে ‘হার্ড’ বা শক্ত বলেছেন তিনি। মূলত বোঝাতে চেয়েছেন, এই দুজনের মতো নির্ভরশীল আর কেউ নন।

অজয় জাদেজা তো আরো এক কাঠি সরেস। সম্প্রতি বিশ্বকাপের জন্য নিজের নির্বাচিত ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে কোহলির বদলে রেখেছেন ধোনিকেই। টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেয়া সেই সাক্ষাৎকারে জাদেজা বলেন, ‘কারো যদি মনে হয় কোহলির অধিনায়কত্ব ধোনির চেয়ে ভালো, সে আমার সাথে কথা বলতে পারে। এই দলটি ভবিষ্যতের জন্য নয়, শুধু বিশ্বকাপের। আমি নিশ্চিত সবাই বলবে ধোনিই বিশ্বকাপের জন্য ভারতের সেরা অধিনায়ক, তাই তাকেই আমি এগিয়ে রেখেছি।’

জাদেজা অবশ্য নতুন ধোনি ভক্ত নন। তিনি অনেক আগেই ধোনিকে সর্বকালের সেরা ওয়ানডে ক্রিকেটারদের একজন বলে মেনে নিয়েছেন। জাদেজার বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েছেন রবিচন্দ্রন অশ্বীন এবং রবীন্দ্র জাদেজাও। তার মতে, এই দুজন বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়েও কার্যকরী হবেন।

ধোনির শেষটা ধোনি নিজেই এই বিশ্বকাপে দেখছেন। শেষটা আরেকটি বিশ্বকাপ দিয়ে রাঙাতে চাইবেন তিনি। ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারও হতে যাচ্ছেন এমএস। অন্য দলগুলোর তাই সতর্ক থাকাটা জরুরি। ভারতের যে একটি মহেন্দ্র সিং ধোনি আছেন!

print