বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে ইয়াসির চমক?

রাহিন ফাইয়াজ: চার বছর আগে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দল ঘোষণার প্রাককাল আর এখনের মাঝে কিছু অদ্ভুত মিল আছে। সেবারও দলের কিছু ক্রিকেটারের জায়গা মুখে মুখে বলে দিয়ে নানা জল্পনা-সমালোচনা তৈরি করেছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। এবারো করেছেন। তবে গতবার আইসিসির কাছে দল পাঠানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে সম্পন্ন করলেও এবার শোনা যাচ্ছে, নিউজিল্যান্ডের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে আইসিসির কাছে দল পাঠিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সেটি গোপনে। দৈনিক সমকাল তাদের নির্ভরযোগ্য সুত্রের বরাত দিয়ে বলছে, সে দলে বড় চমক নতুন মুখ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান ইয়াসির আলি রাব্বি।

বাকি দলে আর চমক নেই। তামিমের ওপেনিং পার্টনার লিটন। বিকল্প ওপেনার হিসেবে নিউজিল্যান্ড কন্ডিশনে ব্যাটিং করার ক্ষমতা এবং বোর্ড সভাপতির প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণে যে সৌম্যই সুযোগ পাবেন, সেটা বোঝাই যাচ্ছিল। তাই কপাল পুড়েছে ইমরুল কায়েসের। ইংলিশ পেস কন্ডিশনে তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ কামরুল রাব্বি, শুভাশিষ রায় কিংবা নবীন খালেদ আহমেদের চেয়ে টিম ম্যানেজমেন্ট ভরসা রেখেছে অভিজ্ঞতার উপরেই। তাই ২০১১ সালের পর আবার বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পেয়েছেন শফিউল ইসলাম। তাই বাদ পড়েছেন তাসকিন ইসলাম। যদিও তিনি থাকছেন স্ট্যান্ডবাই হিসেবে।

এত আগে দল দেয়ার কারণ তাহলে কী? আইসিসির নির্দেশ অনুযায়ী ২৩ এপ্রিলের মাঝে দল চুড়ান্ত করতে হবে প্রতিটি দেশকে। তবে ২৩ মে’র আগ পর্যন্ত এই দলে খেলোয়াড় বদল করা যাবে। তার কারণ, যেকোনো সময় চোটে পড়তে পারেন ক্রিকেটাররা। এই সুযোগটার ব্যবহার করতে চাচ্ছে বিসিবি। আগে দল পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে চায় তারা।

কে এই ইয়াসির রাব্বি?

২৩ বছর বয়সী রাব্বির পুরো নাম ইয়াসির আলি চৌধুরি। চট্টগ্রামের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় লিগে ব্রাদারসের হয়ে খেললেও সম্প্রতি নজর কেড়েছেন বিপিএলে।  চিটাগাং ভাইকিংসের হয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস এসেছে তার ব্যাট থেকে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, বিপিএলে ১১ ম্যাচ খেলে তার রান ছিল ৩০৭। ২৭.৯০ গড়টা চোখে পড়ার মতো না হলেও নিজের দিনে খেলেছেন বড় ইনিংস। ১২৪.২৯ স্ট্রাইক রেট ছিল পুরো টুর্নামেন্টেই দেশি ক্রিকেটারদের মাঝে অন্যতম। আর অনভিষিক্ত দেশি ক্রিকেটারদের মাঝে ছিলেন সেরা পারফর্মার। ভাইকিংসের তৃতীয় র্সবোচ্চ রানসংগ্রহকারী ব্যাটসম্যান ছিলেন তিনি। তাই জায়গা পেয়েছিলেন ইএসপিএন ক্রিকইনফোর বিপিএলের সেরা একাদশেও।

ইয়াসির আলি রাব্বি

ঢাকা লীগেও দুর্দান্ত খেলে যাচ্ছেন এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। যেই দলেই খেলেন, রাব্বি হয়ে দাঁড়ান সেই দলের অন্যতম ব্যাটিং ভরসা। ব্রাদারসের হয়ে লীগে গত ৮ ইনিংসে তার সংগ্রহ ৩৯২ রান। আছে একটি সেঞ্চুরি এবং দুটি ফিফটি। এই ৮ ইনিংসে তার গড় চোখ কপালে তুলে দেয়ার মতোই। ৭৮.৪। কয়েকদিন আগেই আবাহনীর বিপক্ষে ১০৬ রানের ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন, যা নজর কেড়েছে নির্বাচকদের।

রাব্বির আরো একটি গুণ আছে। ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি বেশ মারকুটে। আবাহনীর বিপক্ষে সেঞ্চুরির ইনিংসেও স্ট্রাইক রেট ৯৪.৬৪। লীগে প্রতিটি ম্যাচেই তার স্ট্রাইক রেট নব্বইয়ের ঘরে। কয়েক ম্যাচে তা ছাড়িয়ে গেছে দেড়শ। নির্বাচকেদের চোখে বেশি পড়েছে রাব্বির এই ব্যাটিং স্টাইল। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর দৃষ্টিতে তিনি সাহসী ব্যাটসম্যানের তকমাটা এখনই পেয়ে গেছেন। ‘রাব্বি বল নষ্ট করে কম। মেরে খেলে। বিপিএলের পর ঢাকা লীগে তার পারফরমেন্সের কারণে জাতীয় দলের যোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সে।’

শফিউলের ফেরা

শফিউল ইসলাম সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন শেষ ২০১৬ সালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে। সে সিরিজে এক ম্যাচ খেলে দুই উইকেট পেয়েছিলেন তিনি। এরপর মাশরাফি, মুস্তাফিজ এবং রুবেল হোসেনের পর তাসকিন হোসেন, কামরুল রাব্বি, শুভাশিষ রায় কিংবা আবু হায়দার রনিদের দলে নিলেও আর দলে আসতে পারেননি ২০১০ সালে দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় দলে আসা এই পেসার।

সম্প্রতি আবার তিনি নির্বাচকদের নজর কেড়েছেন বিপিএলের মাধ্যমে। বিপিএলে ১৫ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়েছেন তিনি। বিপিএল তার ভালো বোলিংই তাকে জায়গা করে দিয়েছিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের দলে। যদিও সাইফুদ্দিন, রুবেল এবং মাশরাফির কারণে আর মাঠে নামা হয়নি তার।

শফিউলের ফেরাটা তাই একটু চমক হয়েই আসছে। যদিও দলে তার জায়গা পাওয়ার মূল কারণ তাসকিনের চোট। দ্রুত সময়ে তাসকিন নিজের ফিটনেস ফিরে পেলে আবার বদল আসতে পারে দলে। বাদ পড়তে পারেন শফিউল। তবে সে সম্ভাবনা কমই। কারণ এখনো বোলিং শুরু করতে পারেননি তাসকিন। পাননি ফিজিও এবং ট্রেনারের ছাড়পত্রও।

টিম কম্বিনেশন

নিউজিল্যান্ড গতকালই নিজেদের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে। সে দলের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের টিম কম্বিনেশনের কথা ভাবলে মূলত যে পার্থক্যটি ধরা পড়ে, তা ব্যাটসম্যানদের প্রতি দেয়া গুরুত্ব। নিউজিল্যান্ড দলে স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন পাঁচজন। কেন উইলিয়ামসন, রস টেলর, মার্টিন গাপটিল এবং হেনরি নিকোলসের পাশাপাশি আছেন কলিন মানরো। সেখানে বাংলাদেশের দলে মূলত ব্যাটসম্যান, এমন ক্রিকেটারই আছেন আটজন।

এই গুরুত্বের কারণ অবশ্য ইংলিশ কন্ডিশন। ব্যাটসম্যানদের ভিড়ে প্রতি ম্যাচেই বড় স্কোর করার চেষ্টা থাকবে টাইগারদের। তামিম ইকবাল এবং লিটন দাসের ওপেনিং পার্টনারশিপের বিকল্প আছেন সৌম্যও। তিনে মোহাম্মদ মিঠুন কিংবা সাব্বির রহমান খেলতে পারেন, দুজনেই আবার থাকতে পারেন লোয়ার মিডল অর্ডারের ভরসা হয়ে। ফর্ম এবং পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে এই জায়গাটি হতে পারে লিটন দাসের, যদিও এখানে প্রাধান্য পাবেন সাকিব আল হাসান। তিন নাম্বারে ব্যাটিং করেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

মিডল অর্ডারই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা, সাকিব, মুশফিক এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, যারা দলের অপরিহার্য অংশও। বিকল্প হিসেবে আছেন রাব্বিও। লোয়ার মিডল অর্ডারে সাইফউদ্দিন এবং মেহেদী হাসানের ফর্মের উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের শক্তি।

স্পিন আক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই কম গুরুত্ব পাবে। পেয়েছেও। সাকিব আল হাসান এবং মেহেদী হাসান মিরাজই এখানে আশা ভরসা। কাজে লাগতে পারে মাহমুদুল্লাহর পার্ট টাইম অফস্পিনও।

টাইগাররা প্রায় সব ম্যাচেই তিন পেসার নিয়ে দল সাজানোর চিন্তা করবে। সেখানে মাশরাফি তো আছেনই। তার পরে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবেন মুস্তাফিজুর রহমান এবং রুবেল হোসেন। আপাত চিন্তিত দল অনুযায়ী এই দুজনের কেউ ভালো না খেললে দলে আসতে পারেন শফিউল ইসলাম। বাংলাদেশ অভাব বোধ করবে একজন শক্তিশালী লেগস্পিনারের। প্রায় অন্য সব ক’টি দলের একটি ভালো লেগস্পিনার আছে। যারা যেকোনো সময়ে ঘুরিয়ে দিতে পারেন ম্যাচের মোড়।

এবারই সবচেয়ে অভিজ্ঞ দল নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নির্বাচক হাবিবুল বাশারের মতো, বাংলাদেশ এবার বিশ্বকাপ খেলতে যাবে নিজেদের ইতিহাসের সেরা দলটি নিয়ে। তাই বিশ্বকাপে ভালো করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। ‘‘বিশ্বকাপ আসে চার বছর পর পর। বিশ্বকাপ সব সময়ই বিশেষ কিছু। এ কারণে দল করতে গিয়ে আমাদের একটু বেশি চিন্তাভাবনা করতে হয়, একটু সময় নিতে হয়। পেছনের যত বিশ্বকাপ দেখেন, এ বছর আমরা সেরা দলটা নিয়েই যাচ্ছি। দলে এত অভিজ্ঞ খেলোয়াড়, এত পারফরমার, আগে এতটা ছিল না।’

বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় সাফল্য এনে দেয়ার দায়িত্বটা তারই

বাংলাদেশের সম্ভাব্য দল: মাশরাফি বিন মুর্তজা(অধিনায়ক), তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, সৌম্য সরকার, লিটন দাস, মোহাম্মদ মিঠুন, সাব্বির রহমান, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মুস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন, মেহেদী হাসান মিরাজ, শফিউল ইসলাম, ইয়াসির আলি রাব্বি

print