হবে কি এজবাস্টন মহাকাব্য?

রাহিন আমিন: গুগলে বাংলাদেশ ভারতের বিশ্বকাপ ম্যাচ লেখে সার্চ দিতেই বাংলাদেশের আগামি ছয় ম্যাচের সূচি চোখের সামনে চলে এলো। কাঙ্খিত ম্যাচের সূচিতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, এই ম্যাচে বাংলাদেশের জেতার সুযোগ শতকরা মাত্র ১৮%। তখনই শব্দটা মাথায় খেলে গেল, মহাকাব্য!

টাইগার সমর্থকরা ক্ষেপে উঠতে পারেন। ভারতের বিপক্ষে জয় বাংলাদেশের জন্য এখন আর কোনোভাবেই মহাকাব্য তুলনীয় নয়। আর জয়ের সম্ভাবনা হিসাব করতে অনেক পরিসংখ্যান ধরা হয়, যার বেশিরভাগই মাঠে কোনো ভূমিকা রাখে না। এর আগের হেড টু হেড ম্যাচে জেতার সংখ্যা হিসেবে ধরলে তো বাংলাদেশের ভারতের সামনে দাঁড়ানোরই কোনো সুযোগ নেই! ভারতের ২৯ জয়ের বিপরীতে যে মাত্র ৫টি জয় বাংলাদেশের। ম্যাচের আগে গুগলের এই জয়ের সম্ভাবনার হিসেবে আস্থা আছে তাই খুব কম মানুষেরই।

তাহলে মহাকাব্য কেন? গত চার বছরের ভারত বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর কথা মনে করে দেখুন, কোনো অ্যাশেজ সিরিজও এমন উত্তাপ ছড়িয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। ২০১৫ সালে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা বাংলাদেশ যখন সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখার সাহসও করে ফেলেছে, তখন কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে যেন প্রায় ব্যবস্থা করে হারিয়ে দেয়া হলো টাইগারদের। সেই শুরু। এরপর দু’দল মুখোমুখি হলেই তা ছড়িয়েছে উত্তাপ। সামাজিক মাধ্যমে সমর্থকরা জড়িয়েছেন বাকযুদ্ধে। এছাড়া বাংলাদেশকে ক্রিকেটদল হিসেবে তাচ্ছিল্য করার পুরনো অভ্যাস ভারতের তো আছেই, এবার বিশ্বকাপেও যা ফুটে উঠেছে স্টার স্পোর্টসের মওকা মওকা বিজ্ঞাপনে।

বিশ্বকাপের সেই ম্যাচের পরে আরো বেশ কয়েকবার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। সিরিজের হিসেবে একবারই। বিশ্বকাপের পরপর সেই সিরিজে ভারতকে টানা দুই ওয়ানডেতে হারিয়ে তথাকথিত প্রতিশোধটাও নিয়েছে বাংলাদেশ। দারুণ জয়, তবে এই জয়কে সত্যিকারের ‘প্রতিশোধ’ বলা যায় কিনা, সেটা বিবেচ্য। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এমন অশুভ কান্ডের পর শুধু একটি সিরিজ জয় বোধহয় পরিপূর্ণ তৃপ্তি এনে দেয় না। এই প্রতিশোধের পৈশাচিক তৃপ্তি পেতে হতে হলে যে মঞ্চটাও অমন বড় হওয়া চাই!

বড় সুযোগও অবশ্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে। পারেনি। পারেনি গতবছর এশিয়া কাপের ফাইনালেও। তাই অতৃপ্তিটা কামড়ে বেড়াচ্ছে অনেকদিন ধরেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রিকেটপ্রেমির ভারতের ব্যাপারে এমন প্রবল আপত্তির কারণটাও সম্ভবত এই অতৃপ্তিই।

এবারো মঞ্চ প্রস্তুত। ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচ বাংলাদেশের জন্য আরো মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শেষের দিকে এসে বিশ্বকাপ নখ কামরানো উত্তেজনা তৈরি করাতে। বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে উঠার প্রাথমিক সমীকরণে ইংল্যান্ডকে তাদের বাকি দুই ম্যাচেই হারতে হতো। গতকাল ভারতের সাথে জিতে যেই আকাশকুসুম চিন্তাকে আগেই বাড়ি পাঠিয়েছে স্বাগতিকরা। এখন যেই সমীকরণ দাঁড়িয়েছে, সেটা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশকে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে যেকোনো মূল্যে জিততে হবে, আর ইংল্যান্ডকে হারতে হবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পরের ম্যাচটিতে।

ভারতের বিপক্ষে জিততে হলে সাকিবের জ্বলে উঠা জরুরি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের ম্যাচ ভারত বাংলাদেশের ম্যাচে দুদিন পরে। বাংলাদেশকে ইংল্যান্ডের দিকে না তাকিয়ে থেকে তাই নিজেদের দায়িত্বটা সারতে হবে। বাকিটা ভাগ্যের হাতেই রচিত হোক। কে জানে, বাংলাদেশ ভারতকে হারিয়ে দিতে পারলে যেই প্রবল আত্মবিশ্বাস পাওয়া যাবে, পাকিস্তান ঘায়েল হতে পারে তাতেই। ভাগ্যবিধাতাও বাংলাদেশের পক্ষে থাকলে তো এদেশ নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মহাকাব্যই রচিত হতে দেখবে!

যে যতো যাই বলুক, আপাতদৃষ্টিতে এই চিন্তাভাবনাকেও বড় অবাস্তব মনে হচ্ছে। কিন্তু তবুও, এতোগুলো পারলে-থাকলে’র সামনে দাঁড়িয়েও সেমিফাইনালেরই স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। কারণ একটাই। গত বেশ কয়েক বছরে ভারত বাংলাদেশের ধরাছোঁয়ার বাইরের দল থেকে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দলে পরিণত হয়েছে। আর কাগজ কলমের হিসেবে এ বিশ্বকাপের পাকিস্তান বাংলাদেশের থেকে দুর্বলই। গতো বিশ্বকাপের পর ছয়বারের দেখায় ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় দুবার। বাকি চারবারেও ভারতকে ছেড়ে কথা বলে নি টাইগাররা। চারবারই খেলা গড়িয়েছে শেষ ওভার পর্যন্ত, দুবার শেষ বল পর্যন্ত।

যৌক্তিকভাবে মনে হচ্ছে, ভারত এবারও বাংলাদেশের বিপক্ষে জেতার জন্য যেকোনো কিছুই করবে। বিশেষ করে গত ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এমন গা-ছাড়া হারের পর কড়া সমালোচনা সামাল দিতেই বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়টা তাদের প্রয়োজন। সেমিফাইনাল প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু তাও পরপর দুই পরাজয়ের মানসিক চাপের এই বিপদ যেভাবেই সম্ভব এড়াতে চাওয়ারই কথা। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল তো প্রায় চাক্ষুষ প্রমাণের পর্যায়ে পড়ে। এবারো যে আইসিসির একচোখা স্বভাব বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে না, তার নিশ্চয়তা কি!

এসব বাদ দিলেও বাংলাদেশের ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে চোট। সেই বিশ্বকাপের প্রথম থেকেই একের পর এক ক্রিকেটার চোটে পড়েছেন। ভাগ্য নেহায়েত ভালো থাকাতে বড় কোনো ম্যাচে বসে থাকতে হয়নি তামিম কিংবা সাইফউদ্দিনের। বিশ্বকাপের দু’দিন আগে তামিম ইকবালকে দিয়ে শুরু, সর্বশেষ কপালের ভাঁজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাহমুদুল্লাহ এবং মাশরাফির চোট। পায়ের মাংসপেশিতে গ্রেড ওয়ান টিয়ার চোটে পড়া মাহমুদুল্লাহ সেরে উঠার আশা দেখালেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয় কিছুই। মাশরাফিও হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট নিয়ে খেলেছেন প্রায় পুরো বিশ্বকাপটাই। সেই চোট বেড়ে এখন গ্রেড টু টিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তবে মাশরাফিরা এসব কিছু নিয়েই ভাবছেন না। নিজের চোটকে তো পাত্তাই দিচ্ছেন না মাশরাফি। ম্যাচের আগে একই হোটেলে থাকা ভারত এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বরং নিজেদের মধ্যে সময়টা ভালোই কাটাচ্ছেন। ধোনির সাথে বেশ মজার সময় কাটিয়েছেন মাশরাফি। কেএল রাহুলের সাথে আড্ডা মারতে দেখা গেছে তামিম ইকবালকেও। মাঠের বাইরে প্রায় আগ্নেয়গিরিসম উত্তাপকে কোনোভাবেই নিজেদের ছুঁতে দিচ্ছেন না তারা।

না দেয়াই ভালো। যতোটা সম্ভব নির্ভার থেকে মাঠে নামতে চাইবেন তামিমরা। ১৭ কোটি জনগণের কাঙ্খিত মহাকাব্য লেখার দায়িত্বের ভারটাও যে কম নয়!

print