নিউজিল্যান্ডকে হতাশ করে ক্রিকেটের মুকুট ইংল্যান্ডের

রাহিন আমিন: খেলা শেষ। জস বাটলার যখন দৌড়ে প্রায় মাঠের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন, তখন ক্যামেরায় কেন উইলিয়ামসনের চেহারা। মাথার ক্যাপটা খুলে চুলে একবার হাত দিলেন। লর্ডসের ড্রেসিংরুমে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বিকেলের সোনালি আলো বাদামি দাড়িতে এসে পড়ছে। যেন পরাজিত গ্রীক দেবতা। উইলিয়ামসনের যন্ত্রনাক্লিষ্ট সেই মুখ ইতিহাস মনে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে। আপাতত সেটা নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। উইলিয়ামসনেরও।

উইলিয়ামসন গ্রীক দেবতাই তো! পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই ছিলেন নিজ দলের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় পৃষ্টপোষক। অনেক ম্যাচেই দলের হয়ে একক যোদ্ধা। দুবার নিজের দলকে নিয়ে গেছেন ফাইনালে। ২০১৫ সালে নাহলে নিজেদের দোষেই হেরেছেন, এবারে তো রীতিমত লটারিতে হেরে হাত ছোঁয়া দুরত্ব থেকে বিশ্বকাপ হারালেন। যেই ম্যাচের ফল বাউন্ডারির হিসেবে নির্ধারিত হয়, তাকে কোনোভাবেই লটারির চেয়ে বেশি কিছু মানতে ইচ্ছে করছে না।  

এই ম্যাচও বা মিথলজির কোনো যুদ্ধের কাহিনীর থেকে কম কী? অনায়াসে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের বিপক্ষে পান্ডবদের যুদ্ধের সাথে তুলনীয়। এই যুদ্ধে কেউ কারো থেকে কম নয়। কেউ এগিয়ে নেই, কেউ পিছিয়ে নেই। তাই মাঠের ফল ভেদ করে সামনে এগিয়ে আসছে যুদ্ধের বাইরের নানা বিষয়।

নিউজিল্যান্ডের জন্য এই গল্প ট্র্যাজেডির। তবে তাতে এই ম্যাচের ক্ষতি নেই। ইকারাসের মৃত্যু তার কাহিনীকে মহত্বই দান করেছে। নিউজিল্যান্ড হেরেছে বলেই নিঃসন্দেহে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপ ফাইনালের তকমা পাবে। বিশ্বকাপ এবং ওয়ানডে ইতিহাসেরই সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যাচ কিনা, এ বিষয়েও তর্ক হতে পারে। শেষ তিন ওভার এবং সুপার ওভারের নাটকে যা হলো, তাতে ঘোরতর ইংলিশ সাপোর্টাররাও স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, এই বিশ্বকাপ নিজেদের হাতে তুলবার অধীকার নিউজিল্যান্ডও রাখে। সেটা ইংল্যান্ডের থেকে বেশি কিনা, প্রশ্ন আসলে সেটাই।

ম্যাচের শুরুতেই বোঝা গিয়েছিল, এই ম্যাচ মূলত ইংল্যান্ডের ব্যাটিং বনাম নিউজিল্যান্ডের বোলিং হবে। সেমিফাইনালের স্কোরকার্ডগুলো দেখুন, তাহলেই বুঝবেন। ব্যাটিং তোপে অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে যখন ফাইনালে ইংল্যান্ড, তখন ভারতের বিপক্ষে স্নায়ু টানটান ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের নায়ক বোলিং। নিউজিল্যান্ডের দেয়া ২৪১ রানের টার্গেটও তাই কম মনে হচ্ছিল না।

দ্বিতীয় ইনিংসের শুরু থেকেই চাপের মুখে ইংল্যান্ড। বিশেষ করে ম্যাট হেনরির প্রথম স্পেলে তো রীতিমত হাটু কাঁপতে দেখা গিয়েছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের। ফলাফল, ২৫তম ওভারে মাত্র ৮৪ রানে চার উইকেট নেই ইংল্যান্ডের। এরপরেই ক্রিজে বেন স্টোকস এবং জস বাটলার। ২৭.৩ ওভারে যখন বাটলারের ব্যাট থেকে ১০০তম রানটি এলো, তখন আস্কিং রান রেটের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, আরেকটি একপেশে ফাইনালে দেখতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ।

মোড় ঘুরালেন স্টোকসই। বাটলারকে সঙ্গে করে ১১০ রানের পার্টনারশিপ। ৪৫ ওভারে বাটলার আউট হওয়ার আগে ক্রিজে দুজনেই এতটাই সেট ছিলেন, যে তখন আবার নিউজিল্যান্ডের জয় বেশ দূরের স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কিন্তু তখন নিউজিল্যান্ডের যোদ্ধা হয়ে দেখা দিলেন পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই দুর্দান্ত খেলা লকি ফার্গুসন। ৪৫তম ওভারের শেষ বলে বাটলারকে ফিরিয়ে পরের ওভারেই এসে আবার নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিস ওকসকে ফেরালেন। কিছুক্ষণ বল-ব্যাটের তুমুল লড়াইয়ের সমীকরণ এসে দাঁড়ালো ১৮ বলে ৩৪ রানে। পরপর দুই উইকেট পড়াতে চাপে ইংল্যান্ড, কিন্তু তখনও স্টোকস আছেন ক্রিজে।

স্টোকস শেষ পর্যন্তই থাকলেন। বোল্টের ওভার থেকে ৪,১,২,০,১,২। ৪৮তম ওভার শেষে সমীকরণ ১২ বলে ২৫।

গাপটিলের এই হতাশা নিউজিল্যান্ডেরই প্রতিচ্ছবি

পরের ওভারে প্লানকেট স্ট্রাইকে। বোলিংয়ে জিমি নিশাম। প্রথম দুই বলে দুবার স্ট্রাইক বদলে প্লানকেট এবং স্টোকস মিলে নিলেন দুই রান। সমীকরণ ১০ বলে ২৩ হয়ে যাওয়াতে আবার পেন্ডুলামের মতো ঘুরতে থাকা চাপটা ইংল্যান্ডের মাথায়। আগামি দু’বলের মাঝে বাউন্ডারি না মারতে পারলে যে জেতা কঠিন হয়ে যাবে। সে কারণেই হাত খুলে মারতে গেলেন প্লানকেট। কিন্তু লং অফের উপর দিয়ে বলটিকে পার করাতে পারলেন না, ধরা পড়লেন বাউন্ডারিতে দাঁড়ানো বোল্টের হাতে।

আরেকটি উইকেট। চাপ যখন প্রায় জাঁকিয়ে বসতে চলেছে ইংল্যান্ডের কাঁধে, তখন আবার নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিলেন বেন স্টোকস। বলটি খেলার আগে অনেকক্ষণ সময় নিলেন। মুখ একটু হা, যেন রোমান গ্ল্যাডিয়েটর। দেশ বাঁচানোর বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। হাটু গেড়ে বসে যেভাবে শ্বাস নিচ্ছিলেন, তাতে চাপ কমানোর প্রচেষ্টা স্পষ্ট। পরের বলে মারতেই হবে। মারলেনও। যেটা লেগসাইডে আবারও বোল্টের হাতে, কিন্তু এবার আর বোল্ট নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ক্যাচ ধরে ফেলেও শেষ মুহুর্তে পা বাউন্ডারি লাইনে। ফলে ছয়। জিততে ৮ বলে ১৬ দরকার ইংল্যান্ডের।

পরের বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্টোকস স্ট্রাইকে পাঠালেন আর্চারকে। যথারীতি আর্চারও প্রথম বলেই সাজঘরে ফিরলেন। যাতে সমীকরণ এসে দাঁড়ায় ছয় বলে ১৫ রানে।

স্ট্রাইকে স্টোকস। অপর প্রান্তে ব্যাটসম্যানের আসা যাওয়ার এই ধারাবাহিকতায় যার মাথায় পাহার সমান বোঝা। প্রথম দুই বলে দুটি নিখুঁত ওয়াইড ইয়র্কার করলেন বোল্ট, যা সেই পরিস্থিতিতে খেলা যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই অসম্ভব।

৪ বলে ১৫ রানের সমীকরণ যখন ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে হচ্ছে, তখনই পরের বলে স্টোকসের ছক্কা। সমীকরণ নেমে এসে ৩ বলে ৯ রানে ঠেকেছে। এরপরের বলেও এমন কিছুই দরকার। স্টোকস লেগসাইডে গ্যাপে খেললেন, লাভ হলো না। এক রান নিয়ে স্ট্রাইক রাখার মরিয়া চেষ্টায় দৌড় দিলেন আরেক প্রান্ত থেকে। গাপটিল বল ডিরেক্ট স্ট্যাম্পের দিকেই মেরেছেন। লাইনের প্রায় কাছাকাছি চলে আসা স্টোকস ঝাপ দিলেন, যার কারণে বল ব্যাটে লেগে সোজা বাউন্ডারির দিকে। উইলিয়ামসন পিছে পিছে অনেকক্ষণ দৌড়ালেন, কিন্তু ততক্ষণে চার হয়ে গেছে। যা নাহলে সমীকরণ গিয়ে দাঁড়াতো ২ বলে ৭। বাই রানে চার এবং একটি ডাবল মিলিয়ে ছয় হওয়াতে যা ২ বলে ৩ রান হয়ে ঠেকেছে।

পরের বলে প্রায় একই ঘটনা ঘটে। বলটাই খেলতে পারলেন না স্টোকস। কোনো মতে বাউন্ডারির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দু’রান নেয়ার চেষ্টায় আউট করলেন আদিল রশিদকে।

শেষ বলে দু’রান দরকার। আবারো একই বল, একই শট খেললেন, কিন্তু এবার লং অফ থেকে বল ফেরত আসলো আরো তাড়াতাড়ি। তাই দ্বিতীয় রানটি নেয়ার চেষ্টায় তাই বহুদূর পিছিয়ে স্টোকস, এবং ম্যাচ টাই। তখনো সুপার ওভারের বিশাল নাটক বাকিই আছে।

নিয়ম হলো, যে দল পরে ব্যাট করেছে, সুপার ওভারে তারা ব্যাট করবে প্রথমে। তাই প্রথমে ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ড। লম্বা ইনিংস খেলা দুই ব্যাটসম্যানকেই নামিয়ে দিলেন অধিনায়ক এওইন মরগান। বাটলার এবং স্টোকস। বোলিংয়ে বোল্ট। ক্রিজে সেট স্টোকসের ৮ রানে এবং বাটলারের ৭ রানে দুই বাউন্ডারিতে সুপার ওভার ১৫ রান তুললো ইংল্যান্ড।

নিউজিল্যান্ডের হয়ে ব্যাটিংয়ে গাপটিল এবং অলরাউন্ডার জিমি নিশাম। প্রথম ২ বলেই এক ওয়াইডে এবং এক ছক্কায় ৯ রান তুলে নেন নিশাম এবং গাপটিল। পরের দুই বলে পরপর দুবার দু’রান এবং পঞ্চম বলে এক রান নিয়ে নিশাম শেষ বলে স্ট্রাইকে পাঠান গাপটিলকে।

আর্চারের সুপার ওভারের শেষ বলটি যেন একদম ট্রেন্ট বোল্টের ম্যাচের শেষ বলের হুবুহু অনুকরণ। লেগ স্ট্যাম্প বরাবর লো ইয়র্কার, গাপটিল ঠেলে দিয়েই দৌড় দিলেন। প্রথম রানটি নিয়ে দ্বিতীয় রানটির জন্যও চেষ্টা করলেন, পারলেন না। বেয়ারস্টোর থ্রো থেকে বল নিয়ে জো রুট যখন স্ট্যাম্প ভেঙ্গে দিয়েছেন, তখন যোজন যোজন দূরে গাপটিল। এরপরই বাটলারের সেই মাঠ পেরোনো উল্লাস, আর লর্ডসের ড্রেসিংরুমে উইলিয়ামসনের সেই পথ হারানো দৃষ্টি।

শেষের তিন ওভার এবং সুপার ওভারের এমন ধারাভাষ্যের মতো বল ধরে ধরে বর্ণনা দেয়ার কারণ একটাই, এই তিন ওভারই পুরো ম্যাচের নাটকীয়তার পরিমাপক। প্রতিটি বলেই ম্যাচ পেন্ডুলামের মতো এদিক থেকে ওদিক গিয়েছে, এবং তিন ওভারের একটি বলকে বাদ দিলেও এই ম্যাচ রিপোর্টকে সম্পূর্ণ বলে মনে হতো না।

শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের হারটা ভাগ্যের কাছেই। তীরে এসে তরী ডুবেছেও বলা যাবে না, এই ম্যাচে তো তারা হারেই নি। শুধু নিপাট ভদ্রলোকের দল বলেই এমন ম্যাচের পরও হার মেনে নিয়ে মাঠ ছেড়েছে তারা। স্টোকসের ব্যাটে লেগে সেই বাই রানের পর উইলিয়ামসনের জায়গায় বিরাট কোহলিকে চিন্তা করলেই সেটা বোঝা যায়।

তবে এই পরাজয় তাদের ইতিহাসের যে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হয়েই থাকবে, তা বোঝা গেল গাপটিলের চেহারা দেখে। শেষ রানটি নিতে ব্যর্থ হয়ে মাঠে হাটু গেড়ে বসে পড়েছেন। দৌড়ে তাকে সান্তনা দিতে গেছেন নিশাম। ততক্ষণে অবশ্য ইংল্যান্ডের দুবার মাঠ চক্কর দেয়া শেষ।

লর্ডসের গ্যালারির উল্লাসকে তখন রীতিমত দানবীয় মনে হচ্ছে। ট্র্যাজিক হিরোদের আবেদন যে তখন ছাপিয়ে গেছে চ্যাম্পিয়নদের আবেদনকেও!

print